মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান সংঘাত আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের পাঁচটি ইরানি তেলবাহী ট্যাঙ্কারে হামলার পর পাল্টা জবাব হিসেবে জর্ডানে মার্কিন বাহিনীর ব্যবহৃত একটি বিমানঘাঁটি লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) দাবি করেছে, হামলায় ঘাঁটির বিভিন্ন সামরিক স্থাপনা ও যুদ্ধবিমান রাখার অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও জর্ডানের পক্ষ থেকে ইরানের দাবির পুরোটা নিশ্চিত করা হয়নি।
মঙ্গলবার রাত থেকে বুধবার সকাল পর্যন্ত জর্ডানের আল-আজরাক এলাকায় অবস্থিত মুওয়াফফাক সালতি বিমানঘাঁটি লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়। ঘাঁটিটিতে মার্কিন সামরিক সদস্য ও যুদ্ধবিমান মোতায়েন রয়েছে। জর্ডানের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, ইরান থেকে ছোড়া ২০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে ১৮টি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিহত করা হয়েছে। বাকি দুটি জনবসতিহীন এলাকায় পড়ে। প্রাথমিকভাবে জর্ডান কোনো হতাহতের খবর জানায়নি।
তবে মার্কিন ঘাঁটিতে যুদ্ধবিমান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে ভিন্ন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। ইরানের আইআরজিসি দাবি করেছে, এফ-১৫, এফ-১৬ ও এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের জন্য ব্যবহৃত রক্ষণাবেক্ষণ, প্রস্তুতি ও মোতায়েন এলাকার পাশাপাশি বিমান রাখার স্থাপনাগুলোতে আঘাত হেনেছে। অন্যদিকে মার্কিন কর্মকর্তারা হামলাটিকে কার্যকর নয় বলে বর্ণনা করেছেন। ফলে কতগুলো মার্কিন বিমান বাস্তবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা কত—তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এই হামলা আসে যুক্তরাষ্ট্রের পাঁচটি ইরানি তেলবাহী ট্যাঙ্কার ধ্বংসের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে। মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড এর আগে দুই দফায় একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে লক্ষ্য করার চেষ্টা করেছিল। ওই হামলা এড়িয়ে যাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানি ট্যাঙ্কারগুলোতে হামলা চালায় বলে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
পাল্টা জবাবে ইরান হরমুজ প্রণালীর আশপাশে অন্তত ১০টি নৌযান লক্ষ্য করার দাবি করেছে। আইআরজিসির ভাষ্য অনুযায়ী, এর মধ্যে দুটি মার্কিন জাহাজ ও আটটি তেলবাহী জাহাজ ছিল। তবে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, কোনো মার্কিন যুদ্ধজাহাজে আঘাত লাগেনি এবং ইরানের সব হামলার চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। ফলে সমুদ্রপথে ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্যের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে।
হরমুজ প্রণালী ঘিরে এই উত্তেজনা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও প্রভাব ফেলেছে। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ তেল ও গ্যাস পরিবহনপথগুলোর একটি এই জলপথ দিয়ে যুদ্ধের আগে বৈশ্বিক তেল ও গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হতো। নতুন করে হামলা ও নৌ চলাচলে অনিশ্চয়তার কারণে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠে গেছে।
এদিকে চলমান সংঘাত দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেছেন, নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরপরই যুদ্ধ শেষ হতে পারে। তবে একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সামরিক হামলা-পাল্টা হামলা অব্যাহত থাকায় সংঘাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি।
জর্ডানে মার্কিন সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং হরমুজ প্রণালীতে নৌযান ঘিরে নতুন উত্তেজনা মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে আরও বিস্তৃত ও জটিল করে তুলেছে। সামরিক সংঘাতের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথে অস্থিরতা বাড়তে থাকায় এর প্রভাব বিশ্ববাজার ও আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতেও পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
