স্টাফ রিপোর্টার :
নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ে চাঁদাবাজির অভিযোগে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন মেঘনা গ্রুপের বিভিন্ন নির্মাণ প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্টরা। তাদের অভিযোগ, পিরোজপুর ইউনিয়নের জৈনপুর এলাকার সড়ক দিয়ে মেঘনা গ্রুপের প্রকল্পে ব্যবহৃত কোনো গাড়ি চলাচল করতে হলে নির্দিষ্ট অঙ্কের চাঁদা দিতে হয়। চাঁদা না দেওয়ায় সম্প্রতি একটি সিমেন্টবাহী গাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে।
এ ঘটনায় সোনারগাঁও থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। তবে মামলার আসামিরা আদালত থেকে জামিনে বেরিয়ে এসে ফের চাঁদা দাবি ও কোম্পানির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হুমকি দিচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয় বাসিন্দা ও মেঘনা গ্রুপের ঠিকাদারি সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, পিরোজপুর ইউনিয়নের জৈনপুর এলাকায় মাহবুবুল ইসলাম সুমনের নেতৃত্বে ১৫ থেকে ২০ জনের একটি চক্র বিভিন্ন কোম্পানি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে চাঁদা দাবি করে আসছে। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে ভয়ভীতি ও হুমকি দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।
সিমেন্টবাহী গাড়িতে হামলা ও লুটপাট
সম্প্রতি বৃহস্পতিবার দুপুরে জৈনপুর এলাকার সড়ক দিয়ে ২০০ বস্তা ফ্রেশ সিমেন্ট নিয়ে একটি পিকআপ মেঘনা ইকোনমিক জোনে নির্মাণাধীন একটি প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্যে যাচ্ছিল। গাড়িটির নম্বর ঢাকা মেট্রো-উ-১২-৩১১৫।
অভিযোগ করা হয়েছে, পিকআপটি জৈনপুর এলাকায় পৌঁছালে চাঁদার দাবিতে এর গতিরোধ করা হয়। এ সময় মাহবুবুল ইসলাম সুমনের নেতৃত্বে ১০ থেকে ১২ জনের একটি দল দেশীয় অস্ত্র নিয়ে গাড়িটি আটকায়।
মেঘনা গ্রুপের সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ওই ব্যক্তিদের হাতে দা, চাপাতি, লোহার রড ও লাঠিসোঁটা ছিল। একপর্যায়ে গাড়িচালকের কাছ থেকে নগদ ৫ হাজার টাকা এবং গাড়িতে থাকা সিমেন্ট লুট করে নেওয়া হয়।
গাড়িচালকের চিৎকার শুনে নির্মাণকাজের ঠিকাদারি প্রতিনিধি আবু সাইদ (৪৪) ও মো. সোপান (২০) ঘটনাস্থলে এগিয়ে গেলে তাদের ওপরও হামলা চালানো হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
থানায় মামলা, জামিনের পর ফের হুমকির অভিযোগ
ঘটনার পর মেঘনা পাল্প অ্যান্ড পেপার লিমিটেডের এজিএম (প্রশাসন) মো. আসাদুল ইসলাম বাদী হয়ে ওই দিন রাতে সোনারগাঁ থানায় মামলা করেন।
মেঘনা গ্রুপের সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, মামলার আসামিরা আদালত থেকে জামিনে বেরিয়ে এসে ফের কোম্পানির লোকজনকে প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছেন। তাদের দাবি, জৈনপুর ও আশপাশের এলাকায় মেঘনা গ্রুপের কোনো গাড়ি প্রবেশ করলে গাড়িপ্রতি ১০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করা হচ্ছে।
ঠিকাদারি সংশ্লিষ্টদের দাবি, এর আগে কয়েক দফায় ওই চক্রকে চাঁদা দেওয়া হলেও নতুন করে আবারও টাকা দাবি করা হচ্ছে। ফলে নির্মাণকাজ পরিচালনা করতে গিয়ে তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
স্থানীয়দের নানা অভিযোগ
জৈনপুর এলাকার কয়েকজন বাসিন্দার অভিযোগ, মাহবুবুল ইসলাম সুমন এলাকায় চাঁদাবাজ হিসেবে পরিচিত। তার নেতৃত্বে একটি দল বিভিন্ন কোম্পানি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে নিয়মিত চাঁদা দাবি করে থাকে। চাঁদা না দিলে সংশ্লিষ্টদের হুমকি দেওয়ার অভিযোগও করেন তারা।
এ ছাড়া সুমনের বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসা ও মাদকসেবীদের আড্ডা পরিচালনার অভিযোগও করেছেন স্থানীয় কয়েকজন। তবে এসব অভিযোগের স্বতন্ত্র সত্যতা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
স্থানীয়দের দাবি, ২০০৭ সালে কুমিল্লার সদর দক্ষিণ থানার এলাকায় ফেনসিডিল নিয়ে সোনারগাঁয়ে আসার সময় সুমনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছিল। এ ঘটনায় ২০০৭ সালের ৩০ জুলাই সদর দক্ষিণ থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা হয় বলে তারা জানান। মামলার নম্বর ৪৫। ওই মামলায় তিনি দীর্ঘদিন কারাগারে ছিলেন বলেও দাবি স্থানীয়দের।
শিল্পায়নে নেতিবাচক প্রভাবের আশঙ্কা
মেঘনা গ্রুপের ঠিকাদারদের অভিযোগ, সরকার দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও শিল্পায়ন বাড়াতে বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত করছে। কিন্তু জৈনপুর এলাকায় চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসের অভিযোগের কারণে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের নির্মাণকাজ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
তাদের আশঙ্কা, চাঁদাবাজি ও নিরাপত্তাহীনতার পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে মেঘনা গ্রুপের বিভিন্ন নির্মাণ প্রকল্পের কাজ ব্যাহত এমনকি বন্ধও হয়ে যেতে পারে।
ঠিকাদারি প্রতিনিধিদের আরও অভিযোগ, মামলার আসামিরা স্থানীয় পুলিশ পরিদর্শক, একাধিক উপপরিদর্শক ও পুলিশ সদস্যদেরও হুমকি-ধমকি দিচ্ছেন।
নির্মাণকাজের ঠিকাদারি প্রতিনিধি আবু সাইদ বলেন, “চাঁদার দাবিতে কোম্পানির সিমেন্টবাহী গাড়িতে হামলা ও লুটপাট করা হয়েছে। এর আগে কয়েকবার কোম্পানির পক্ষ থেকে চাঁদা দেওয়া হলেও আবারও নতুন করে টাকা দাবি করা হচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “থানায় মামলা করার পরও হুমকি অব্যাহত রয়েছে। এতে মেঘনা গ্রুপের নির্মাণাধীন প্রকল্পের কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।”
আরেক ঠিকাদারি প্রতিনিধি বলেন, শুভ ও সুমনের নেতৃত্বাধীন চক্রকে কোম্পানির পক্ষ থেকে কয়েক দফায় টাকা দেওয়া হয়েছে বলে তারা দাবি করেন। এরপরও আবার মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করা হচ্ছে। চাঁদাবাজির মামলায় জামিনে বেরিয়ে এসেও তারা ফের চাঁদা দাবি করছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
পুলিশের বক্তব্য
সোনারগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল বারিক বলেন, “চাঁদাবাজদের গ্রেপ্তারে পুলিশ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। জামিনে বের হয়ে কেউ হুমকি-ধমকি দেওয়ার চেষ্টা করলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
মেঘনা গ্রুপের ঠিকাদার ও স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রত্যাশা, পুলিশ দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নিলে জৈনপুর এলাকায় চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসের অভিযোগে সৃষ্ট পরিস্থিতির অবসান হবে এবং নির্মাণকাজ স্বাভাবিকভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে।

Leave a Reply