মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাত নতুন করে তীব্র হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে। হরমুজ প্রণালী ঘিরে সামরিক উত্তেজনা, তেলবাহী ট্যাঙ্কারে হামলা এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় বিশ্ববাজারে তেলের দামে বড় ধরনের ঊর্ধ্বগতি দেখা দিয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ০.১ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০১.৩৪ ডলারে পৌঁছায়। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুডের দাম ০.৫ শতাংশ বেড়ে ৯৬.৫৫ ডলারে লেনদেন হয়।
এর আগের দিন বুধবার ব্রেন্টের দাম ১০০ ডলারের সীমা অতিক্রম করে। জুলাইয়ের পর এই প্রথম আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড আবারও ১০০ ডলারের ওপরে উঠল। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাল্টাপাল্টি হামলা এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল পরিবহন নিয়ে অনিশ্চয়তাই বাজারে নতুন করে সরবরাহ-উদ্বেগ তৈরি করেছে।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালী দিয়ে যুদ্ধ শুরুর আগে বৈশ্বিক তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হতো। বর্তমানে সংঘাতের কারণে ওই পথে জ্বালানি প্রবাহ স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কমে গেছে। ফলে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে আরও চাপ তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বাজার বিশ্লেষকেরা।
এদিকে তেলের দাম আরও বাড়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। গোল্ডম্যান স্যাকসের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল উৎপাদন ও সরবরাহ দীর্ঘ সময় বাধাগ্রস্ত হলে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১২০ ডলারের ওপরে উঠতে পারে।
তেলের বাজারে এই ঊর্ধ্বগতির পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের ইরানি তেলবাহী ট্যাঙ্কারে হামলাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, ইরানের সঙ্গে সংঘাতের মধ্যে পাঁচটি তেলবাহী ট্যাঙ্কার ধ্বংস করা হয়েছে। এর পর ইরান হরমুজ প্রণালীর আশপাশে একাধিক নৌযান লক্ষ্য করে হামলার দাবি করেছে।
অন্যদিকে জর্ডানে অবস্থিত মুওয়াফফাক সালতি বিমানঘাঁটিতে ইরানের হামলায় একাধিক মার্কিন সামরিক বিমান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবরও এসেছে। রয়টার্স জানিয়েছে, সিবিএসের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী একটি এ-১০ থান্ডারবোল্ট যুদ্ধবিমানের একটি ডানা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং প্রায় আটটি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান সামান্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এফ-১৫গুলো পরে আবার কার্যক্রমে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
জর্ডানের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, ওই হামলায় ইরান থেকে ছোড়া ২০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে ১৮টি প্রতিহত করা হয়েছে। বাকি দুটি জনবসতিহীন এলাকায় পড়ে এবং হামলায় কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
হরমুজ প্রণালীর পাশাপাশি সৌদি আরবেও ইরান-সমর্থিত হুতিদের হামলার খবর পাওয়া গেছে। এতে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি অবকাঠামো ও পরিবহনপথ নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাতের পরিধি বাড়তে থাকলে তেল সরবরাহে বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটতে পারে এবং তার প্রভাব পড়তে পারে বিশ্ব অর্থনীতি, পরিবহন ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির ওপর।
ফলে ১০০ ডলারের মাইলফলক পেরিয়ে যাওয়া তেলের বাজারে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাত কতদিন স্থায়ী হবে এবং হরমুজ প্রণালীর মাধ্যমে জ্বালানি সরবরাহ কত দ্রুত স্বাভাবিক হবে। সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আরও বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে।

Leave a Reply