মেসির বিদায়ের পর আর্জেন্টিনার সামনে যে বড় চ্যালেঞ্জ

একটি যুগের শেষ মানেই শুধু একজন কিংবদন্তির বিদায় নয়; অনেক সময় সেটি একটি দলের পরিচয় বদলে যাওয়ার মুহূর্তও। লিওনেল মেসির আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা তাই আর্জেন্টিনার জন্য নিছক আবেগের খবর নয়, বরং তাদের ফুটবলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সবচেয়ে বড় বাস্তবতা।

৩৯ বছর বয়সে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানার সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন মেসি। ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের কাছে হারের পরই সিদ্ধান্তটি নিয়ে ভাবতে শুরু করেছিলেন তিনি। অবশেষে ৩১ আগস্ট আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দেন আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি।

মেসির বিদায়ের পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—কে নেবেন তার জায়গা? কে সামলাবেন তার গোল, সৃজনশীলতা, নেতৃত্ব কিংবা কঠিন মুহূর্তে ম্যাচের গতিপথ বদলে দেওয়ার সেই অসাধারণ ক্ষমতা?

তবে আর্জেন্টিনার জন্য সবচেয়ে বড় ভুল হবে একজন ‘নতুন মেসি’ খোঁজা। মেসির মতো একজন ফুটবলার তৈরি হয় না পরিকল্পনা করে, আর তার সরাসরি বিকল্পও তৈরি করা সম্ভব নয়। বরং মেসির সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার হতে পারে এমন একটি দল, যেখানে একজন খেলোয়াড়ের ওপর পুরো দায়িত্ব নির্ভর করবে না।

এই জায়গাতেই বড় পরীক্ষা কোচ লিওনেল স্কালোনির। দীর্ঘদিন মেসিকে ঘিরে যে আর্জেন্টিনা নিজেদের শক্তি তৈরি করেছে, এখন সেই দলকে ধীরে ধীরে মেসি-নির্ভরতা থেকে বের করে আনতে হবে। পরিবর্তনটা শুধু একাদশে নয়, দলের চিন্তাভাবনাতেও আনতে হবে।

আক্রমণে জুলিয়ান আলভারেজ হতে পারেন নতুন কেন্দ্রবিন্দু। তবে তার ওপর মেসির মতো খেলা নিয়ন্ত্রণ করার প্রত্যাশা চাপিয়ে দেওয়া ঠিক হবে না। বরং তার গতি, পজিশনিং ও গোল করার ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে নতুন আক্রমণভাগ গড়ে তুলতে পারে আর্জেন্টিনা।

মাঝমাঠেও দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এনজো ফার্নান্দেজ ও অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারকে ঘিরে এমন একটি মিডফিল্ড গড়ে তোলা সম্ভব, যেখানে দলের সৃজনশীলতা কোনো একক খেলোয়াড়ের ওপর নির্ভর করবে না। ভবিষ্যতের জন্য নিকো পাজ ও ফ্রাঙ্কো মাস্তানতুওনোর মতো তরুণদেরও ধীরে ধীরে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব নিতে হবে।

রক্ষণভাগে ক্রিস্তিয়ান রোমেরো ও লিসান্দ্রো মার্তিনেজের অভিজ্ঞতা দলকে স্থিরতা দিতে পারে। অন্যদিকে গারনাচো, সোল ও এচেভেরির মতো আক্রমণাত্মক প্রতিভাদের সামনে থাকবে নিজেদের পরিচয় তৈরি করার বড় সুযোগ।

মেসির বিদায়কে তাই আর্জেন্টিনার দুর্বলতার শুরু হিসেবে দেখলে পুরো ছবিটা দেখা হবে না। বরং এটি হতে পারে নতুন একটি আর্জেন্টিনা তৈরির সবচেয়ে বড় সুযোগ। এমন একটি দল, যেখানে মেসির অনুপস্থিতি পূরণ করার চেষ্টা না করে তার রেখে যাওয়া মানদণ্ডকে সামনে রেখে নতুন নেতৃত্ব তৈরি হবে।

আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শুরু হয়েছিল ২০০৫ সালে। দীর্ঘ ২১ বছরের যাত্রায় তিনি দেশের হয়ে রেকর্ড ২০৭ ম্যাচ খেলেছেন এবং করেছেন ১২৫ গোল। তার সবচেয়ে বড় সাফল্যের মধ্যে রয়েছে ২০২১ কোপা আমেরিকা, ২০২২ বিশ্বকাপ ও ২০২৪ কোপা আমেরিকার শিরোপা। ২০২৬ বিশ্বকাপেও আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে তুলেছিলেন তিনি।

মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার অবশ্য সবসময় সাফল্যে মোড়া ছিল না। ২০১৬ সালে কোপা আমেরিকার ফাইনালে হারের পর সাময়িক অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন তিনি। তখন জাতীয় দলের হয়ে বড় কোনো শিরোপা না জেতায় তাকে ঘিরে ছিল তীব্র সমালোচনা। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সেই গল্প পুরোপুরি বদলে যায়।

তাই মেসির বিদায়ের পর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু ম্যাচ জেতা নয়, প্রত্যাশার সেই পাহাড় সামলানো। মেসির যুগে আর্জেন্টিনার জয় অনেক সময় নির্ভর করেছে তার ব্যক্তিগত জাদুর ওপর। মেসি-পরবর্তী সময়ে জয়কে হতে হবে পুরো দলের কৃতিত্ব।

সম্ভবত এটাই মেসির পর আর্জেন্টিনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা—একজন কিংবদন্তির জায়গা আরেকজন নিতে পারেন না, কিন্তু একটি দল মিলে সেই শূন্যতার ভার বহন করতে পারে।

মেসি চলে যাচ্ছেন। এখন আর্জেন্টিনার সামনে প্রশ্নটা তাই ‘পরের মেসি কে?’ নয়। আসল প্রশ্ন—মেসিকে ছাড়া আর্জেন্টিনা নিজেদের নতুন করে কতটা আবিষ্কার করতে পারে?

সেই উত্তরই নির্ধারণ করবে, মেসির পরের আর্জেন্টিনা শুধু একটি কিংবদন্তির উত্তরাধিকার বহন করবে, নাকি নিজের নতুন ইতিহাস লিখবে।

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *