পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সামরিক উত্তেজনা আরও তীব্র হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র পাঁচটি ইরানি তেলবাহী ট্যাংকার ধ্বংসের দাবি করার পর পাল্টা অভিযানের কথা জানিয়েছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। তাদের দাবি, দুটি মার্কিন জাহাজ ও আটটি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালানো হয়েছে। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালির ‘নিষিদ্ধ ও অনিরাপদ’ এলাকায় প্রবেশের চেষ্টা করা আরও ১০টি জাহাজকেও লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের বরাতে আইআরজিসির নৌবাহিনীর এই দাবি প্রকাশিত হয়। আইআরজিসি বলেছে, পারস্য উপসাগরে পাঁচটি ইরানি ট্যাংকারে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবেই তাদের পাল্টা অভিযান চালানো হয়েছে। হামলায় লক্ষ্যবস্তু করা জাহাজগুলোতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলেও দাবি করেছে তারা।
তবে ইরানের দাবির বিপরীতে মার্কিন পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত দুই মার্কিন জাহাজ ও আটটি ট্যাংকারে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির স্বাধীন নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি। ফলে এই অংশটি আপাতত আইআরজিসির দাবি হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছিল, ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে দুই দফা লক্ষ্যবস্তু করার চেষ্টা করে। মার্কিন সামরিক বাহিনীর দাবি, জাহাজটি হামলা এড়িয়ে যেতে সক্ষম হয় এবং কোনো মার্কিন সেনা আহত হয়নি।
এরপর যুক্তরাষ্ট্র পাঁচটি ইরানি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালিয়ে সেগুলো ধ্বংস বা অকার্যকর করে বলে সেন্টকম জানায়। মার্কিন বিবৃতি অনুযায়ী, ট্যাংকারগুলোর মধ্যে চারটি গালফ অব ওমানে এবং একটি খার্গ দ্বীপের কাছে ছিল। হামলার আগে জাহাজগুলোর ক্রুদের সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল বলেও যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে।
ইরানের পাল্টা প্রতিক্রিয়া শুধু সমুদ্রপথে সীমাবদ্ধ থাকেনি। আইআরজিসি জানিয়েছে, তারা জর্ডানে মার্কিন বাহিনী ব্যবহৃত আল-আজরাক ঘাঁটিতেও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। জর্ডানের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ২০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে ১৮টি ধ্বংস করেছে; বাকি দুটি জনবসতিহীন এলাকায় পড়ে। এতে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
এদিকে হরমুজ প্রণালিতে সামুদ্রিক চলাচলও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার মাত্র ছয়টি পণ্যবাহী জাহাজ প্রণালিটি অতিক্রম করেছে, যেখানে আগের দিন এই সংখ্যা ছিল নয়টি এবং ১০ দিনের গড় ছিল ১২টি। যুদ্ধের কারণে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে জাহাজ চলাচল আরও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। সংঘাতের কারণে এই নৌপথে অনিশ্চয়তা বাড়ায় আন্তর্জাতিক বাজারেও এর প্রভাব পড়ছে। বুধবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠে যায় বলে রয়টার্স জানিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাল্টাপাল্টি সামরিক পদক্ষেপে ছয় মাস ধরে চলা সংঘাত নতুন করে আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে তেলবাহী জাহাজ, মার্কিন সামরিক স্থাপনা এবং হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সংঘাত অব্যাহত থাকলে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তার পাশাপাশি বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহেও বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।

Leave a Reply