হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যের মাটির ঘর

নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি :

একসময় নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার প্রায় প্রতিটি গ্রামেই দেখা মিলত মাটির ঘরের। চারপাশে সবুজ গাছপালা আর মাঝখানে সারি সারি মাটির ঘর—এ দৃশ্যই ছিল গ্রামবাংলার চিরচেনা রূপ। সময়ের পরিবর্তনে ইট, সিমেন্ট ও কংক্রিটের দালানের ভিড়ে সেই ঐতিহ্য এখন প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে। অথচ প্রাকৃতিকভাবে শীতল পরিবেশ, কম নির্মাণ ব্যয় এবং পরিবেশবান্ধব বৈশিষ্ট্যের কারণে একসময় গ্রামবাসী মাটির ঘরকে আদর করে ডাকতেন ‘গরিবের এসি’।

স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, রূপগঞ্জে এখনো প্রায় দুই শতাধিক মাটির ঘর টিকে আছে। তবে নতুন করে আর খুব একটা নির্মাণ হচ্ছে না। ফলে শত বছরের এই ঐতিহ্য ধীরে ধীরে বিলুপ্তির পথে।

মাটির ঘর নির্মাণে সাধারণত এঁটেল বা দো-আঁশ মাটি ব্যবহার করা হয়। মাটির সঙ্গে খড়, ধানের তুষ কিংবা পাটের আঁশ মিশিয়ে তা আরও শক্ত করা হয়। এরপর স্তরে স্তরে দেয়াল গেঁথে নির্মাণ করা হয় পুরো ঘর। প্রতিটি স্তর শুকাতে সময় লাগে প্রায় এক মাস। এভাবে ধাপে ধাপে একটি ঘর নির্মাণে ছয় থেকে সাত মাস পর্যন্ত সময় লেগে যায়। তবে সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করলে এমন ঘর ৫০ থেকে ১০০ বছর পর্যন্ত টিকে থাকতে পারে।

মাটির ঘরের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর স্বাভাবিক তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা। দিনের গরম ধীরে ধীরে শোষণ করে রাতের দিকে তা ছেড়ে দেয় মাটির দেয়াল। ফলে গ্রীষ্মে ঘরের ভেতর থাকে শীতল, আবার শীতকালে বাইরের ঠান্ডা সহজে প্রবেশ করতে পারে না। এই কারণেই গ্রামবাংলার মানুষ একে ‘গরিবের এসি’ হিসেবে চিনতেন।

কিন্তু আধুনিক জীবনযাত্রা, ইট-পাথরের দালানের প্রতি মানুষের ঝোঁক, দক্ষ কারিগরের সংকট এবং অতিবৃষ্টিতে ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কার কারণে মাটির ঘরের নির্মাণ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।

স্থানীয় এক প্রবীণ বাসিন্দা বলেন, “মাটি হচ্ছে খাঁটি। আগে আমাদের মাটির ঘর ছিল। গরমের দিনে পাখা ছাড়াই আরাম লাগত। এখন ছেলেরা দালান করেছে, কিন্তু ছাদে এত গরম লাগে যে সেই আরাম আর পাই না। এখনো কেউ বাড়িতে এলে আমি মাটির ঘরের গল্প করি।”

তিনি জানান, নতুন প্রজন্মকে এই ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে রূপগঞ্জের সি-শেল পার্কে দুটি মাটির ঘর সংরক্ষণ করা হয়েছে। দর্শনার্থীরা সেখানে গিয়ে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী আবাসন সম্পর্কে জানতে পারেন।

মাটির ঘর নির্মাণের কারিগরদের একজন জানান, “আগে এই কাজ করেই সংসার চলত। এখন কাজ নেই বললেই চলে। বাধ্য হয়ে মুদির দোকান করেছি। একটি মাটির ঘর করতে ছয়-সাত মাস সময় লাগে। লাল মাটি, তুষ আর কাদা মিশিয়ে ধাপে ধাপে দেয়াল তুলতে হয়। গরমে ঠান্ডা আর শীতে গরম থাকে বলে এই ঘর মানুষের শরীরের জন্যও ভালো।”

পরিবেশবিদ মীর আব্দুল আলীম বলেন, “মাটির ঘরের কথা মনে হলেই শৈশবের স্মৃতি ফিরে আসে। একসময় বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রামেই অসংখ্য মাটির ঘর ছিল। এগুলো শুধু বসতবাড়ি নয়, আমাদের ইতিহাস ও সংস্কৃতির অংশ। বিভিন্ন পার্ক ও উন্মুক্ত জাদুঘরে মাটির ঘর সংরক্ষণ করে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা উচিত।”

রূপগঞ্জ উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. তানসিব জুবায়ের নাদিম বলেন, “মাটির ঘরের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এর প্রাকৃতিক ভেন্টিলেশন ব্যবস্থা। এতে ঘরের তাপমাত্রা স্বাভাবিকভাবে নিয়ন্ত্রিত থাকে। গরমে ঠান্ডা এবং শীতে উষ্ণ পরিবেশ তৈরি হয়। মানুষের সুস্থ থাকার জন্য তাপমাত্রার ভারসাম্য গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া প্রকৃতির কাছাকাছি বসবাস মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের জন্যও উপকারী।”

স্থানীয়দের মতে, মাটির ঘর কেবল একটি বসতবাড়ি নয়; এটি বাংলার শত বছরের ঐতিহ্য, পরিবেশবান্ধব স্থাপত্য এবং গ্রামীণ সংস্কৃতির প্রতীক। তাই এই ঐতিহ্য সংরক্ষণে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি ব্যক্তি ও সামাজিক পর্যায়ে সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। ঐতিহ্যবাহী মাটির ঘর সংরক্ষণ, কারিগরদের প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহায়তা এবং পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে মাটির ঘরের প্রদর্শন বাড়ানো গেলে হারিয়ে যেতে বসা এই ঐতিহ্য নতুন করে প্রাণ ফিরে পেতে পারে।

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *