মানিকগঞ্জের জেলার শিবালয় উপজেলার আরিচা ঘাট এলাকার স্পিডবোট ঘাটে যাত্রীদের থেকে অতিরিক্ত টাকা আদায়, টিকিট না দেওয়া সহ নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে শিবালয় উপজেলা শ্রমিকদলের বহিষ্কৃত নেতা আতোয়ার রহমানের বিরুদ্ধে। আতোয়ার রহমান শিবালয় ইউনিয়নের ১ নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি মো: আয়নালের ছেলে।
ক্ষমতার পালাবদলের পর থেকেই কোন কিছুর তোয়াক্কা না করে, প্রশাসনকে বৃদ্ধা আঙ্গুলি দেখিয়ে স্পিডবোট ঘাট নিয়ন্ত্রণ ও অবৈধভাবে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় সহ নানা অভিযোগ রয়েছে এই চক্রের মূল হোতা হিসেবে পরিচিত আতোয়ার রহমানের বিরুদ্ধে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে আরিচা ঘাট এলাকায় স্পিডবোট চলাচলকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন অনিয়ম, অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ও টিকিট না দেওয়া বা চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে। এ নিয়ে সাধারণ যাত্রী ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যেও ক্ষোভ বিরাজ করছে।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে নিয়ে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন পোস্টও দেখা গেছে যেখানে বিগত সময়ে ফ্যাসিস্ট আওয়ামিলীগ নেতাদের আস্থাভাজন হিসেবেও তার নাম উঠে এসেছে।
বর্তমানেও আতোয়ার রহমান ও তার লোকজন একটি প্রভাবশালী রাজনৈতিক চক্রের পরিচয় ব্যবহার করে ঘাট নিয়ন্ত্রণ করছে এবং স্পিডবোটের সাধারন যাত্রীদের জিম্মী করে জোরপূর্বক অতিরিক্ত টাকা আদায় করছে।
যাত্রীরা দাবি করেন, ঘাট এলাকায় সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক ব্যবসায়িক পরিবেশ বিঘ্নিত হচ্ছে। এসব অনিয়ম বন্ধে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেন সাধারণ যাত্রীরা।
এদিকে স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দারা জানান, আরিচা ঘাট এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই প্রভাব বিস্তার করে আসছে আতোয়ার রহমান। আরো জানিয়েছেন তিনি মূলত মানিকগঞ্জ জেলার আওয়ামী লীগের অর্থ সম্পাদক, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান রহিম খানের ঘনিষ্ঠ লোক, এখনো পর্যন্ত তার ব্যবসা-বাণিজ্য সহ আওয়ামী লীগের অন্যান্য নেতা কর্মীদের সম্পদ ও ব্যবসা বাণিজ্য দেখভাল করেন এই আতাউর রহমান।
স্পিডবোট ঘাটে ভাড়ার বিষয়ে জানতে চাইলে যাত্রীরা জানায়, আগে ২০০ টাকা করে ভাড়া নেওয়া হতো এবং টিকিটও দেওয়া হতো কিন্তু এখন ২৫০ টাকা করে নিচ্ছে তারপরও কোন টিকিট দিচ্ছে না। আমাদের নিরূপায় হয়ে এভাবেই যেতে হচ্ছে।
এক যাত্রী বলেন,” টাকা দিয়ে টিকিট কেটেছি কিন্তু টিকিট পাইনাই ”
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় মূলত ঘাটে স্পিডবোটের সকল যাত্রীদের থেকে টিকিট না দিয়ে বরং অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়া হচ্ছে যার ফলে কোন প্রকার টিকিট যাত্রীদের সরবরাহ করা হচ্ছে না এবং অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে স্পিডবোট ছাড়ার পাশাপাশি যাত্রীদের নিরাপত্তার জন্য নূন্যতম নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে লাইফ জ্যাকেটও পড়ার নিময় থাকলেও তা ব্যবহার করা হচ্ছে না।
গত ১৯-০৩-২৬ তারিখে শিবালয় উপজেলা জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সিনিয়র সহসভাপতি আতোয়ার রহমানকে সাময়িক বহিষ্কার করে জেলা শ্রমিকদল। জেলা শ্রমিক দলের সভাপতি মোঃ আব্দুল কাদের ও সাধারন সম্পাদক মোঃ আব্দুর রাজ্জাক লিটন স্বাক্ষরিত এক পত্রে আতোয়ারের বহিষ্কার আদেশে উল্লেখ করা হয় ” দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ, নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগের সাথে জড়িত থেকে সংগঠনের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করা, সংগঠনের গ্রুপিং তৈরি করা সহ নানাবিধ সংগঠনবিরোধী কর্মকান্ডে জড়িত থাকার কারণে তার সমস্ত প্রকার সংগঠনিক পদ এবং সাধারণ সদস্য পদ থেকে অব্যাহতি দেয়া হলো। ”
অথচ সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় বহিষ্কারের পরও এখণো ঘাটের যাত্রীদের থেকে অতিরিক্ত টাকা আদায় সহ ঘাটে এখনো রয়েছে তার একক প্রভাব।
নানা অপকর্ম ও আওয়ামী সম্পৃক্ততা ইতিমধ্যে জেলার নেতাদের দৃষ্টিগোচর হলে তার বহিষ্কার আদেশের পরও ঘাটের অঘোষিত নিয়ন্ত্রক হিসেবে বার বার উঠে আসছে আতোয়ার রহমানের নাম।
স্থানীয় লোকজন আরও জানান, বিশেষ কোন ক্ষমতাশালী মহলের ইন্ধনে গুরুতর অভিযোগে উপজেলা শ্রমিকদল থেকে বহিষ্কার হওয়ার পরও আরিচা ঘাটে তিনি দাপটের সাথে নানা অপকর্ম চালিয়ে যাওয়ার সাহস পাচ্ছেন।
আরিচাঘাটে যাত্রীদের নানা অভিযোগ ভিডিও করে প্রতিবেদক ঘাট থেকে ফেরার পথে ঘাটেই একদল লোক প্রতিবেদককে আটকে ধরেন এবং বলেন আতাউর ভাই আসতেছে আপনাদের সাথে কথা বলতে তারপর যান।
এমতাবস্থায় প্রতিবেদক বেশ কিছু সময় ঘাটে বসে অপেক্ষা করার পরে আতোয়ার রহমান আরও বেশ কয়েকজন লোকজন নিয়ে এসে উচ্চস্বরে প্রতিবেদকে উদ্দেশ্য করে বলেন, আপনার কিছু জানার থাকলে আমাকে বলবেন, আমার সাথে কথা বলবেন আপনি কার অনুমতি নিয়ে ঘাটে যাত্রীদের ইন্টারভিউ নিয়েছেন। ঘাটে যাত্রীদের ইন্টারভিউ নিতে হলে তার অনুমতি নিতে হবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন আমার সাথে আগে কথা বলে তারপর না হয় যাত্রীদের সাথে কথা বলতে পারবেন। কাউকে কিছু বলা নাই, কওয়া নাই এসেই যাত্রীদের বক্তব্য ভিডিও করতেছেন। আপনারা যান এখান থেকে, যা পারেন করেনগা, আমিও দেখবো কি করতে পারেন।
একপর্যায়ে প্রতিবেদক আরিচা স্পিডবোট ঘাটে নানা অনিয়ম ও অতিরিক্ত ভাড়া দেয়ার বিষয়ে আতাউর রহমানের কাছে তার সম্পৃক্ততার বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বক্তব্য দিতে রাজি হননি।
পরবর্তীতে মুঠোফোনে কল দিয়ে আতোয়ার রহমানের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি ফোনে কোন কথা বলতে চান না বলে কল কেটে দেন।
নানা অনিয়ম ও স্পিড বোর্টের যাত্রীদের থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএ এর পোর্ট অফিসার সুব্রত রায় বলেন,” আমরাতো বোর্ট তো বন্ধ করে দিয়েছি। এখন বোট চালানোর বিষয়ে আমাদের কিছু জানা নেই। আমি যতদূর জানি কাজিরহাট থেকে কিছু যাত্রী আসে কিন্তু আরিচা থেকে স্পিডবোর্ট চলার বিষয়ে আমার কিছু জানা নেই। আমার কাছে এ বিষয়ে কোন তথ্য নেই। কোন অনিয়ম থাকলে আপনারা নিউজ করতে পারেন এবং এ বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার থাকলে থানা প্রশাসনকে বলেন।”
তবে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় সহ নানা অনিয়মের বিষয়ে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল।