আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন সংক্রান্ত গণভোটকে সামনে রেখে নির্বাচন প্রস্তুতি এবং সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যালোচনায় একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। আজ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে এ বৈঠক হয়।
বৈঠক শেষে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম জানান, নির্বাচন আর মাত্র তিন সপ্তাহ বাকি থাকায় প্রশাসনিক প্রস্তুতি ও নিরাপত্তা প্রস্তুতি—এই দুই বিষয় গভীরভাবে পর্যালোচনা করা হয়েছে। নির্বাচন সংক্রান্ত সব প্রস্তুতি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব ও লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) আব্দুল হাফিজ। এ ছাড়া তিন বাহিনী প্রধান, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, মুখ্য সচিব, নির্বাচন কমিশন সচিব, স্বরাষ্ট্র সচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি), র্যাব, আনসার ও কোস্ট গার্ডসহ সব আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রধান এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বৈঠকে অংশ নেন।
প্রেস সচিব জানান, নির্বাচন কমিশন নিশ্চিত করেছে—৩০০ আসনেই একই দিনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। পাবনা-১ ও পাবনা-২ আসনের সীমানা নির্ধারণ নিয়ে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল, তা নিরসন হয়েছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি এই দুই আসনসহ সারা দেশে একযোগে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।
তিনি জানান, আজ প্রতীক বরাদ্দের দিন। আজ মধ্যরাত থেকেই পোস্টাল ব্যালট ছাপা শুরু হবে এবং আগামীকাল সকাল থেকে তা পূর্ণমাত্রায় চলবে।
নির্বাচন ব্যবস্থাপনায় এবার মোট ৬৯ জন রিটার্নিং কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করবেন। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনায় প্রথমবারের মতো আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ৬৪ জন জেলা প্রশাসক রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্বে থাকবেন। সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তাসহ মোট সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সংখ্যা ৫৯৮ জন।
মনোনয়নপত্র সংক্রান্ত তথ্যে জানানো হয়, মোট ২ হাজার ৫৬৮ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র দাখিল করেন। এর মধ্যে রাজনৈতিক দলের প্রার্থী ২ হাজার ৮৭ জন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী ৪৮১ জন। যাচাই-বাছাই শেষে বৈধ প্রার্থী দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৮৪২ জন। নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে মোট ৫১টি রাজনৈতিক দল।
মনোনয়ন বাতিলের বিরুদ্ধে ৬৪৫টি আপিল করা হয়। এর মধ্যে ৪২৫টি আপিল মঞ্জুর, ২০৬টি নামঞ্জুর এবং ১৪টি আপিল প্রত্যাহার করা হয়েছে।
নির্বাচনী অবকাঠামো প্রসঙ্গে প্রেস সচিব জানান, সারা দেশে ৩০০ আসনে মোট ভোটকেন্দ্র রয়েছে ৪২ হাজার ৭৭৯টি এবং ভোটিং বুথ রয়েছে ২ লাখ ৪৭ হাজার ৪৯৯টি। মোট ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ৭৭ লাখের বেশি।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা কমিটি এবং ৩০০টি নির্বাচনী অনুসন্ধান কমিটি গঠন করা হয়েছে। ভোটের আগে চার দিন, ভোটের দিন ও ভোটের পর দুই দিন—মোট আট দিনের জন্য ৬৫৭ জন বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট ও ১ হাজার ৪৭ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে ন্যূনতম ১৫ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। সাধারণ কেন্দ্রে ১৫ থেকে ১৭ জন এবং ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে ১৮ থেকে ১৯ জন সদস্য মোতায়েন থাকবে। প্রথমবারের মতো ভোটকেন্দ্রের ভেতরে প্রিজাইডিং কর্মকর্তার নিরাপত্তায় সশস্ত্র আনসার সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন।
অধিক ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্রগুলোতে ২৫ হাজার ৫০০টি বডি ক্যামেরা ব্যবহার করা হবে। আজ বৈঠকে এসব বডি ক্যামেরার লাইভ ট্রায়াল প্রদর্শন করা হয়। বডি ক্যামেরার মাধ্যমে লাইভ স্ট্রিমিং ও এসওএস পাঠানো যাবে, যা সক্রিয় হলে সমন্বিত নিরাপত্তা ব্যবস্থার মাধ্যমে দ্রুত প্রতিক্রিয়া নিশ্চিত করা হবে।
প্রেস সচিব জানান, কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে স্থানীয় পুলিশের পাশাপাশি সেনাবাহিনী স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে দ্রুত ব্যবস্থা নেবে। এবার প্রথমবারের মতো এক লাখের বেশি সেনাসদস্য, পাঁচ হাজারের বেশি নৌবাহিনী সদস্য এবং তিন হাজার ৭৩০ জনের বেশি বিমানবাহিনী সদস্য মোতায়েন থাকবে।
নতুন উদ্যোগ হিসেবে প্রায় ৫০০টি ড্রোন ও ৫০টি ডগ স্কোয়াড ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ‘নির্বাচন সুরক্ষা অ্যাপ্লিকেশন’ ব্যবহার করা হবে, যার মাধ্যমে কেন্দ্রভিত্তিক নিরাপত্তা তদারকি করা সম্ভব হবে।
বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্যের সারসংক্ষেপ তুলে ধরে শফিকুল আলম বলেন, প্রধান উপদেষ্টা জোর দিয়ে বলেছেন—এই নির্বাচন যেন নিখুঁতভাবে অনুষ্ঠিত হয় এবং দেশ গর্ব করে বলতে পারে এটি একটি ভালো নির্বাচন হয়েছে। নির্বাচন কমিশনকে সব ধরনের সহযোগিতা দিতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
সুত্রঃ বাসস