সাবেক সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় বেশ আলোচিত অবসরপ্রাপ্ত তিন তারকা জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে সোমবার (২৩ মার্চ) গভীর রাতে অভিযান চালিয়ে রাজধানীর বারিধারা ডিওএইচএস এলাকার বাসা থেকে আটক করা হয়। 6 ডিবি প্রধান শফিকুল ইসলামের নেতৃত্বে পরিচালিত এক বিশেষ অভিযানে ডিবির একটি দল বারিধারা ডিওএইচএসের ২ নম্বর লেনের ১৫৩ নম্বর বাড়ি থেকে তাকে গ্রেফতার করে। 5 ডিএমপির ডিবি প্রধান শফিকুল ইসলাম বলেন, মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে পাঁচটি মামলা আছে। এসব মামলায় তাঁকে গ্রেফতার দেখানো হবে।
মাসুদ উদ্দিন ১৯৫৪ সালের ৩০ জুন ফেনী জেলার সোনাগাজী উপজেলার মতিগঞ্জ ইউনিয়নের সুলাখালী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। 16 তিনি ১৯৭৫ সালে রক্ষীবাহিনীতে যোগ দেন, যেটি পরে সেনাবাহিনীতে আত্তীকরণ করা হয়।
পারিবারিক সূত্রে তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ছোট ভাই মরহুম সাঈদ ইস্কান্দারের ভায়রা ভাই — অর্থাৎ খালেদা জিয়া পরিবারের আত্মীয়।
২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব নেয় এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকট (এক-এগারো নামে পরিচিত) শুরু হয়। এ সময় মাসুদ উদ্দিন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৯ম পদাতিক ডিভিশনের প্রধান (জিওসি) ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, সে সময় তিনি তার অধীনস্থ ব্যাটালিয়নের সহযোগিতায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ভবন, বঙ্গভবনের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেন। 11 মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ৯ম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি হিসেবে এতটাই ক্ষমতাশালী ছিলেন যে তাকে দেশের “দ্বিতীয় সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি” বলে বিবেচনা করা হতো এবং তিনি বর্তমান প্রধানমন্ত্রীসহ সাবেক প্রধানমন্ত্রীদের গ্রেফতারের তদারকি করেন।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার দুর্নীতি-অনিয়ম দূর করতে গুরুতর অপরাধ দমন সংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটি গঠন করে যার প্রধান সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্ব পান মাসুদ উদ্দিন। 19 দুর্নীতি দমনের নামে এই কমিটির মাধ্যমে বিভিন্ন শীর্ষ ব্যবসায়ীকে আটক করা হয়।
সেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় কথিত “মাইনাস টু ফর্মুলা” বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হয়, যেখানে সকল রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয় এবং আওয়ামী লীগ ও বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বকে পাল্টে ফেলে রাজনীতিকে নতুন চেহারা দেওয়ার অপচেষ্টা চালানো হয়। এই ফর্মুলার অন্যতম কারিগর ছিলেন মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী।
অভিযোগ রয়েছে, তারেক রহমানকে গ্রেফতারের পর সামরিক গোয়েন্দা হেফাজতে মাসুদের তত্ত্বাবধানে নির্মম নির্যাতন চালানো হয়। এমনকি তাকে ওপরে তুলে শূন্য থেকে ফ্লোরে ফেলে মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার মতো ভয়াবহ অভিযোগও ওঠে।
২০০৮ সালে তাকে অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশ হাইকমিশনের কমিশনার হিসেবে নিয়োগ করা হয়। 10 সেনাবাহিনী থেকে অবসর গ্রহণের পরেও আওয়ামী লীগ সরকার তার চাকরির মেয়াদ একাধিকবার বৃদ্ধি করে। 5 ২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফেনী-৩ আসনে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী প্রথমে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চেয়ে ফরম কিনে জমা দিয়েছিলেন। পরে তিনি জাতীয় পার্টিতে যোগ দেন। দলটির নীতিনির্ধারণী পর্ষদ সভাপতিমণ্ডলীর সদস্যপদ পান। জাপার মনোনয়নে নির্বাচন করেন। 11 তিনি ২০১৮ ও ২০২৪ — উভয় নির্বাচনেই জাতীয় পার্টির মনোনয়নে ফেনী-৩ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
২০২৫ সালের আগস্টে সিআইডি মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ও আরও ৩২ জনের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলা দায়ের করে। তাঁর এজেন্সি “ফাইভ এম ইন্টারন্যাশনাল”-এর মাধ্যমে প্রায় ১০,০০০ মালয়েশিয়াগামী শ্রমিকের কাছ থেকে ১০০ কোটি টাকারও বেশি আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। 9 ২০১৬ সালের ১৮ আগস্ট থেকে ২০২৪ সালের ৩০ মে পর্যন্ত মোট ৯,৩৭২ জন কর্মীকে মালয়েশিয়ায় পাঠানোর সময় সরকার নির্ধারিত ফি-র অতিরিক্ত জনপ্রতি ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং আরও ৩৬,৫০০ টাকা আদায় করার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
ঢাকার একটি আদালত দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তার স্থাবর সম্পত্তি জব্দ ও ফ্রিজের আদেশ দেয়। দুদক আদালতে জানায়, মালয়েশিয়ায় শ্রমিক প্রেরণের নামে প্রতারণামূলক আর্থিক লেনদেনে তিনি জড়িত ছিলেন।
আইন-শৃঙ্খলা সূত্র জানিয়েছে, একটি হত্যা মামলায়ও তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা ছিল।
তাকে ২০০৭ সালের ১/১১ রাজনৈতিক পট পরিবর্তনে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগেও অভিযুক্ত করা হয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী আত্মগোপনে চলে যান, কারণ বিক্ষোভকারীরা ফেনীতে তার ব্যক্তিগত বাসভবনে ভাঙচুর ও আগুন দেয়। 3 ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান ও সরকার পরিবর্তনের পর থেকে তিনি জনসম্মুখে ছিলেন না এবং শেষ পর্যন্ত ডিবির জালে ধরা পড়লেন।