বাংলা চলচ্চিত্রে এমন কিছু নাম থাকে, যাদের উপস্থিতি কেবল অভিনয়জগতেই সীমাবদ্ধ থাকে না—তারা হয়ে ওঠেন সময়ের সাক্ষী, সংস্কৃতির প্রতিনিধি। তেমনই একজন কিংবদন্তি অভিনেত্রী ফরিদা আক্তার ববিতা, যিনি আজ পা রাখলেন জীবনের ৭২ বছরে।
১৯৫৩ সালের ৩০ জুলাই, বাগেরহাটের ফকিরহাটে জন্ম নেওয়া এই অভিনেত্রীর শৈশব কেটেছে চট্টগ্রাম ও ঢাকায়। সাংস্কৃতিক আবহে বেড়ে ওঠা ববিতার মনে ছোটবেলা থেকেই সিনেমার প্রতি এক অদৃশ্য টান তৈরি হয়েছিল। বড় বোন সুচন্দা যখন অভিনয় জগতে পা রাখেন, তখন ববিতারও শুরু হয় রূপালী জগতে পা রাখার প্রস্তুতি।
শিশুশিল্পী হিসেবে ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানো মেয়েটি অল্প সময়েই পরিণত হন বড় পর্দার অপরিহার্য মুখে। তার ক্যারিয়ারে সত্যিকার মোড় আসে মৃণাল সেনের ‘তিতাস একটি নদীর নাম’-এ ‘গৌরী’ চরিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে। ওই একটি চরিত্রই বাংলা চলচ্চিত্রকে পৌঁছে দেয় আন্তর্জাতিক দরবারে, আর ববিতার নাম ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বব্যাপী। এরপর সত্যজিৎ রায়ের ‘অশনি সংকেত’ তাকে এনে দেয় আরও এক ইতিহাস—বাংলাদেশের একমাত্র নায়িকা হিসেবে তিনি স্থান পান অস্কারজয়ী পরিচালকের সিনেমায়।
সত্তর ও আশির দশকে ববিতা হয়ে ওঠেন রোমান্টিক থেকে সংগ্রামী—সব ধরনের চরিত্রের প্রাণ। ‘নটী বিনোদিনী’, ‘সারেং বউ’, ‘বহ্নিশিখা’, ‘রূপালী সৈকত’, ‘দুই জীবন’ কিংবা ‘পোকা মাকড়ের ঘর বসতি’— প্রতিটি সিনেমায় তিনি যেন নিজেকে নতুন করে সৃষ্টি করেছেন। তার অভিনয় কেবল সংলাপে সীমাবদ্ধ ছিল না, ছিল দেহভাষা, অভিব্যক্তি ও গভীর মানসিক উপলব্ধিতে পূর্ণ।
অভিনয়ে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি আটবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেছেন। ২০১৬ সালে লাভ করেন ‘আজীবন সম্মাননা’। সর্বশেষ তাকে দেখা গেছে নারগিস আক্তারের ‘পুত্র এখন পয়সাওয়ালা’ চলচ্চিত্রে।
বর্তমানে ববিতা ছেলের সঙ্গে কানাডায় বসবাস করছেন। জন্মদিন উপলক্ষে এবার কোনো আনুষ্ঠানিকতা নেই, তবে একান্ত প্রিয় মানুষের সঙ্গে নিভৃতে দিনটিকে উদ্যাপন করছেন তিনি। কানাডা থেকে ফোনে জানান, “এবার জন্মদিনে কোনো বিশেষ আয়োজন করছি না। অনিক অফিস থেকে বাসায় ফিরলে দুজনে হয়তো কোনো ভালো রেস্টুরেন্টে যাব। এখানে আত্মীয়স্বজন নেই তেমন, তাই সাদামাটাভাবেই দিনটি কাটবে।”
ববিতা শুধু একজন অভিনেত্রী নন, তিনি বাংলা চলচ্চিত্রের এক জীবন্ত অধ্যায়। তার প্রতিটি চরিত্র, প্রতিটি দৃশ্য যেন এক একটি শিল্পকর্ম। সাহস, মমতা, সংবেদনশীলতা আর আত্মনিবেদনের এক অনন্য মিশ্রণে তৈরি তার দীর্ঘ অভিনয়জীবন আজও অনুপ্রেরণা দেয় শিল্পপ্রেমীদের।