নিজস্ব প্রতিবেদক: ঢাকায় অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া প্রথম ইন্টারন্যাশনাল হার্ট ফেলিউর কনফারেন্স ২০২৬ উপলক্ষে রবিবার (২৯ মার্চ) রাজধানীর বিএমইউ সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে অনুষ্ঠিত হয়েছে প্রি-কনফারেন্স ওয়ার্কশপ। এ কর্মশালায় মেডিকেল আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই), কার্ডিয়াক ম্যাগনেটিক রেজোন্যান্স ইমেজিং (কার্ডিয়াক এমআরআই) এবং এন্ডোমায়োকার্ডিয়াল বায়োপসি-র আধুনিক অগ্রগতি ও ব্যবহার নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
বাংলাদেশে এই প্রথমবারের মতো এআই-ভিত্তিক ডায়াগনস্টিকস এবং উন্নত কার্ডিয়াক ইমেজিং প্রযুক্তি নিয়ে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় বলে আয়োজকরা জানিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞরা জানান, হার্ট ফেলিউর দ্রুত শনাক্তকরণ, নির্ভুল রোগ নির্ণয় এবং রোগীর ভবিষ্যৎ ঝুঁকি মূল্যায়নে এআই প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে কার্ডিয়াক এমআরআই হৃদযন্ত্রের গঠন ও কার্যকারিতা নির্ভুলভাবে মূল্যায়নে বর্তমানে ‘গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ওয়ার্কশপে দেশি-বিদেশি হৃদরোগ বিশেষজ্ঞরা অংশ নিয়ে বাংলাদেশে উন্নত চিকিৎসা প্রযুক্তির বাস্তবায়ন এবং প্রযুক্তিনির্ভর হৃদরোগ ব্যবস্থাপনা সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, এআই ও আধুনিক ইমেজিং প্রযুক্তির সমন্বয় দেশে হৃদরোগ চিকিৎসায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।
বিএমইউ সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের ৫০৭ নম্বর কক্ষে আয়োজিত এ প্রি-কনফারেন্সের উদ্বোধনী বক্তব্য দেন বিএমইউ’র ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক ডা. মোঃ শাহিনুল আলম।
স্বাগত বক্তব্য রাখেন কার্ডিওলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ সফিউদ্দিন।
এআই-বেইজড মেডিক্যাল ম্যানেজমেন্ট বিষয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মালয়েশিয়ার ডিজিটাল হেলথ বিশেষজ্ঞ ডা. সুলতান কাভেরি। এছাড়া বক্তব্য দেন এভায়কেয়ার হাসপাতালের অধ্যাপক ডা. মোঃ আতাহার আলী।
অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বে অনুষ্ঠিত কার্ডিয়াক এমআরআই ওয়ার্কশপে সভাপতিত্ব করেন বিএমইউ কার্ডিওলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. মনজুর মাহমুদ।
ভাইস-চেয়ারের দায়িত্ব পালন করেন সহযোগী অধ্যাপক ডা. জাফর ইকবাল জামালী। এ পর্বে প্যানেলিস্ট হিসেবে উপস্থিত ছিলেন:সুইজারল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি হসপিটাল জুরিখের অধ্যাপক ডা. রোবার্ট মানকা ,বিএমইউ হার্ট ফেলিউর ডিভিশনের প্রধান সহযোগী অধ্যাপক ডা. দীনে মুজাহীদ মোঃ ফারুক ওসমানী
সহযোগী অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ সাহিদুল হক এছাড়া অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিএমইউ’র প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (গবেষণা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. মোঃ মুজিবুর রহমান হাওলাদার, নিওনেটোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মোঃ আব্দুল মান্নানসহ আরও অনেক হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসক।
ইন্টারঅ্যাকটিভ প্রশিক্ষণে গুরুত্ব গুরুত্বপূর্ণ এই ওয়ার্কশপটি একটি ইন্টারঅ্যাকটিভ প্রশিক্ষণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ডিজাইন করা হয়, যেখানে লাইভ ডেমোনস্ট্রেশন ও ব্যবহারিক সেশন অন্তর্ভুক্ত ছিল। সেশনগুলোতে বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়
এআই-সহায়ক কার্ডিয়াক ইমেজিং ব্যাখ্যা কার্ডিয়াক এমআরআই সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ ক্লিনিক্যাল কার্ডিওলজি কার্যপ্রবাহে এআই টুলের সংযুক্তি হার্ট ফেলিউর নির্ণয় ও ব্যবস্থাপনায় কেস-ভিত্তিক আলোচনা আয়োজকদের মতে, এসব সেশনের মূল লক্ষ্য ছিল উদীয়মান প্রযুক্তি ও বাস্তব ক্লিনিক্যাল প্রয়োগের মধ্যে ব্যবধান কমানো, যা কনফারেন্সের মূল থিমের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
হার্ট ফেলিউর চিকিৎসায় এআই-এর সম্ভাবনা বিশেষজ্ঞরা বলেন, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) ইতোমধ্যে কার্ডিওভাসকুলার চিকিৎসায় বিপ্লবাত্মক পরিবর্তন আনতে শুরু করেছে। রোগী নির্বাচন, রোগ নির্ণয়, ঝুঁকি বিশ্লেষণ ও প্রগনোসিস নির্ধারণ—সব ক্ষেত্রেই এআই কার্যকর সহায়ক হিসেবে কাজ করতে পারে।
এআই সিস্টেম দ্রুত বৃহৎ ডেটাসেট বিশ্লেষণ করতে পারে এবং বিশেষ করে জটিল রোগীর ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করতে সক্ষম।তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেন, অধিকাংশ এআই টুল এখনও উন্নয়ন বা প্রাথমিক ক্লিনিক্যাল পর্যায়ে রয়েছে। ফলে এগুলোকে ব্যাপক ব্যবহারের আগে বৈজ্ঞানিক যাচাই ও মানদণ্ডভিত্তিক মূল্যায়ন প্রয়োজন।
কার্ডিয়াক এমআরআই কেন গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে জানানো হয়, কার্ডিয়াক এমআরআই উচ্চ রেজোলিউশনের নন-ইনভেসিভ ইমেজিং প্রদান করে এবং এতে রেডিয়েশন এক্সপোজার নেই। ফলে এটি হার্ট ফেলিউর রোগীদের সঠিক রোগ নির্ণয় ও ব্যবস্থাপনায় অত্যন্ত কার্যকর।
ওয়ার্কশপে বিশেষভাবে তুলে ধরা হয় এআই ও কার্ডিয়াক এমআরআই-এর যৌথ ব্যবহারের সুবিধা। এর মাধ্যমে— কার্ডিয়াক স্ট্রাকচারের স্বয়ংক্রিয় সেগমেন্টেশন দ্রুত ইমেজ প্রসেসিং ও রিপোর্টিং ভেন্ট্রিকুলার ফাংশনের পরিমাণগত মূল্যায়ন
সূক্ষ্ম মায়োকার্ডিয়াল অস্বাভাবিকতা শনাক্তকরণ আরও সহজ ও কার্যকরভাবে করা সম্ভব।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এ সমন্বয় চিকিৎসা-দক্ষতা বৃদ্ধি করে, পর্যবেক্ষকভেদে পার্থক্য কমায় এবং উন্নত কার্ডিয়াক ইমেজিংকে আরও সহজলভ্য করতে সাহায্য করে।
বাংলাদেশে সফল বাস্তবায়নের জন্য যা প্রয়োজন ওয়ার্কশপে বিশেষজ্ঞরা বলেন, বাংলাদেশে এ ধরনের প্রযুক্তির কার্যকর ক্লিনিক্যাল বাস্তবায়নের জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ প্রয়োজন। যেমন—অবকাঠামো উন্নয়ন
উন্নত কার্ডিয়াক ইমেজিং সেন্টার স্থাপনএমআরআই-সামঞ্জস্যপূর্ণ কার্ডিয়াক সফটওয়্যার ও এআই টুলের প্রাপ্যতা
নির্ভরযোগ্য ডেটা সংরক্ষণ ব্যবস্থাশক্তিশালী ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থা প্রশিক্ষণ ও মানবসম্পদ উন্নয়ন
চিকিৎসক ও টেকনোলজিস্টদের বিশেষায়িত প্রশিক্ষণপ্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ জনবল তৈরি ব্যয় ও প্রাপ্যতা
প্রযুক্তি ব্যবহারের খরচ কমানো রোগী ও হাসপাতাল পর্যায়ে সহজলভ্যতা বৃদ্ধি নৈতিক ও নিয়ন্ত্রক কাঠামো
স্বাস্থ্যসেবায় এআই ব্যবহারের জন্য মানসম্মত গাইডলাইন ডেটা গোপনীয়তা ও রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ
স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য এআই টুলের যাচাই ও গবেষণা নতুন যুগের সূচনা ,বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রি-কনফারেন্স ওয়ার্কশপ বাংলাদেশে প্রযুক্তিনির্ভর কার্ডিওলজির নতুন যুগের সূচনা করেছে।
মেডিকেল এআই ও কার্ডিয়াক এমআরআই-এর সমন্বয় হার্ট ফেলিউরের প্রাথমিক শনাক্তকরণ, ঝুঁকি নির্ধারণ ও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি আনতে পারে। তবে এই প্রযুক্তিকে নিয়মিত ক্লিনিক্যাল ব্যবহারে রূপ দিতে হলে বাংলাদেশকে অবকাঠামো, প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও নিয়ন্ত্রক কাঠামোতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
সঠিক পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে এসব প্রযুক্তি দেশের কার্ডিওভাসকুলার চিকিৎসার মান এবং রোগীর চিকিৎসা-ফলাফল উভয় ক্ষেত্রেই বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবে।