ছয় মাসের ব্যবধানে ভিন্নচিত্র দেখলো বাংলাদেশ। একজন গেলো পালিয়ে ঘৃনা নিয়ে। আর একজন উন্নত চিকিৎসার জন্য লন্ডনে ছেলে কাছে গেলেন মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে। পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিদেশে চিকিৎসার জন্য আবেদন করেছিলেন অন্তত ১৮ বার। অনুমোদন তো দুরের কথা, শুনতে হয়েছে নানা উপহাস ও কটু কথা।
দীর্ঘদিন ধরেই বিএনপির দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতা, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডন রয়েছেন। এখন খালেদা জিয়াও লন্ডন গেলেন। ফলে দেশে দলীয় নেতৃত্ব কেমন হবে, ছেলে তারেক রহমানের সঙ্গে আগামী নির্বাচন বিষয়ে আলোচনা হবে কি না, যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলগুলোর মধ্যে ঐক্য ধরে রাখা।
কিংবা অতি সম্প্রতি শিক্ষার্থীরা নতুন দল গঠনের যে কথা বলেছেন, সে নিয়ে বিএনপির উদ্বেগ নিরসন হবে কীভাবে—এসব বিষয় সামনে আসছে। তবে বিএনপি নেতারা বলছেন, তারা এসব নিয়ে উদ্বিগ্ন নন। তারা আশা করছেন, চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ হয়ে খালেদা জিয়া দেশে ফিরবেন এবং দল ও দেশকে নেতৃত্ব দেবেন।
অন্যদিকে, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেশে ফেরা নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি। দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ সম্প্রতি লন্ডনে গিয়েছিলেন তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা করতে। দেশে ফিরে এসে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের বলেছিলেন, তারেক রহমানের দেশে ফেরার মতো উপযুক্ত পরিবেশ এখনো তৈরি হয়নি।
পরিবেশ তৈরি হলে শিগগির তিনি দেশে ফিরবেন। এ অবস্থায় খালেদা জিয়াও দেশ ছাড়লেন। এখন দেশে প্রধান দুই নেতার শূন্যতা দলের মধ্যে কী প্রভাব পড়বে, তা নিয়ে উদ্বেগ আছে দলটির অনেকেরই মধ্যেই।
রাত সাড়ে ১১টায় উড়ল খালেদা জিয়ার বিমান: রাত সাড়ে ১১টার কিছু পর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ছাড়ে খালেদা জিয়াকে বহন করা কাতার আমিরের পাঠানো বিশেষ বিমান ‘রয়েল এয়ার অ্যাম্বুলেন্সটি’। এর আগে রাত সোয়া ৮টায় গুলশানের বাসভবন ফিরোজা থেকে বিমানবন্দরের উদ্দেশে সাদা রঙের একটি গাড়িতে করে রওনা দেন তিনি। গাড়িতে তার পাশে ছিলেন ছোট ছেলে প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী সৈয়দা শামিলা রহমান সিঁথি। বিএনপিপ্রধানকে বিদায়ী শুভেচ্ছা জানাতে বিমানবন্দর এলাকায় উপস্থিত ছিলেন হাজার হাজার নেতাকর্মী।
এর আগে ফিরোজায় খালেদা জিয়ার ছোট ভাই শামীম ইস্কান্দার ও তার স্ত্রী কানিজ ফাতিমা, প্রয়াত ভাই সাঈদ ইস্কান্দারের সহধর্মিণী নাসরিন ইস্কান্দারসহ আত্মীয়-স্বজনরা বিদায় জানান। ফিরোজা থেকে রওনা হওয়ার পর পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের কড়া নিরাপত্তার পাশাপাশি কয়েক হাজার নেতাকর্মী খালেদা জিয়ার গাড়িবহরকে গুলশানের বাসা থেকে এসকর্ট দিয়ে বিমানবন্দরে পৌঁছে দেন।
কাতারের রাজধানী দোহায় কিছু সময় যাত্রাবিরতি দিয়ে আজ বুধবার সকালে লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দরে নামার পর খালেদা জিয়াকে সরাসরি হাসপাতালে নেওয়া হবে। খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসক অধ্যাপক এজেডএম জাহিদ হোসেন জানিয়েছেন, বিশেষায়িত হাসপাতাল ‘লন্ডন ক্লিনিকে’ বিএনপি চেয়ারপারসনকে ভর্তি করা হবে। সেখানকার চিকিৎসকরাই তার পরবর্তী চিকিৎসার বিষয়ে সব সিদ্ধান্ত নেবেন।
জানা গেছে, লন্ডনে খালেদা জিয়ার চিকিৎসার সামগ্রিক সমন্বয় করবেন তার পুত্রবধূ হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. জুবাইদা রহমান এবং অধ্যাপক ডা. শাহাবুদ্দিন তালুকদারের নেতৃত্বে ছয় সদস্যের মেডিকেল টিম। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের কয়েকজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরও লন্ডনে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
সবশেষ সাড়ে সাত বছর আগে যুক্তরাজ্যেই চিকিৎসা নিতে গিয়েছিলেন ৭৯ বছর বয়সী খালেদা জিয়া। সেবার চোখ ও পায়ের চিকিৎসা নিয়েছিলেন। প্রায় তিন মাসের বেশি সময় পর ওই বছরের ১৮ অক্টোবর দেশে ফিরেছিলেন তিনি। ৭৯ বছর বয়সী খালেদা জিয়া লিভার সিরোসিস ছাড়াও হৃদরোগ, কিডনি, আর্থ্রাইটিসসহ নানা স্বাস্থ্য জটিলতায় দীর্ঘদিন ভুগছেন।