শারদীয় দুর্গাপূজায় সারাদেশে তিন স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থাসহ পুলিশকে ৩৫টি নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। মোতায়েন করা হয়েছে পর্যাপ্ত পুলিশ সদস্য। গুজব ছড়ানোর বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সব ইউনিটকে সজাগ থাকতে বলা হয়েছে।
মাঠ পুলিশকে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের কার্যক্রমের ওপর কঠোর গোয়েন্দা নজরদারি করারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয় দুর্গাপূজায় আইন-শৃঙ্খলাসহ সার্বিক বিষয়ে নিবিড় পরিবীক্ষণ করবে। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেছেন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বন্ধন আগের চেয়ে আরও বেশি উন্নত হবে এবং দুর্গাপূজায় কোথাও নিরাপত্তার কোনো ঝুঁকি নেই।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যানুযায়ী, এ বছর সারাদেশে ৩১ হাজার ৫৭৬টি পূজা মণ্ডপে দুর্গাপূজা হবে। এর মধ্যে ঢাকা মহানগরীর ২৫৮টি মণ্ডপ ও মন্দিরে দুর্গাপূজা আয়োজনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৭ হাজার ৫৪টি পূজা মণ্ডপকে অধিক গুরুত্বপূর্ণ, ১০ হাজার ৯৭২টি গুরুত্বপূর্ণ এবং ১৩ হাজার ৫৫০টি পূজা মণ্ডপকে সাধারণ হিসেবে ধরা হয়েছে। অধিক গুরুত্বপূর্ণ ৭ হাজার ৫৪টি পূজা মণ্ডপে বিশেষ নিরাপত্তা দেবে পুলিশ।
পুলিশকে ৩৫ নির্দেশনা
পুলিশকে প্রাক পূজার নিরাপত্তায় ১১ নির্দেশনা, পূজাচলাকালীন ১৬ নির্দেশনা ও প্রতিমা বিসর্জন ও বিসর্জন পরবর্তী ৮ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এতে, পূজা মণ্ডপ, নির্মাণাধীন প্রতিমার নিরাপত্তা নিশ্চিতে টহল ও গোয়েন্দা কার্যক্রম জোরদার করা; প্রতিটি থানার ওসিকে প্রতিটি পূজা মণ্ডপ পরিদর্শন এবং পূজা আয়োজক কমিটির সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে বলা হয়েছে। নির্মাণাধীন প্রতিমা ও প্রতিমা নির্মাণ স্থানের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং নির্মাণস্থলে আইপি ক্যামেরা এবং সিসি ক্যামেরা স্থাপন ও মনিটর করা; প্রতিমা নির্মাণকালীন, প্রতিমা পরিবহনের নিরাপত্তায় আয়োজক কমিটির ভেটিংডপূর্বক স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ করতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি নিষিদ্ধ সংগঠনের কার্যক্রম মনিটর করা এবং জামিনে মুক্তিপ্রাপ্ত নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের কার্যক্রমের ওপর গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করতেও বলা হয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ পূজা মণ্ডপে বিশেষ নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে হ্যান্ডহেল্ড মেটাল ডিটেক্টর ও আর্চওয়ে স্থাপন করা; ভিআইপি, ভিভিআইপি ও বিদেশি অতিথিদের পরিদর্শনকালীন সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা; পূজা উদযাপন কমিটি কর্তৃক পূজা মণ্ডপে নারী ও পুরুষদের জন্য পৃথক প্রবেশ ও প্রস্থান পথের ব্যবস্থা করা; আগত দর্শনার্থীদের স্বেচ্ছাসেবক দ্বারা দেহ তল্লাশি করা (নারীদের ক্ষেত্রে নারী স্বেচ্ছাসেবক দ্বারা), কোন দুস্কৃতিকারী পূজা মণ্ডপে এলাকায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করলে তাৎক্ষণিকভাবে গ্রেপ্তার করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বলা হয়েছে। প্রতিমা বিসর্জনের স্থানসমৃহের তালিকা সংগ্রহ ও প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ; প্রতিমা নিয়ে শহর প্রদক্ষিণ না করে নির্ধারিত রুটে বিসর্জন স্থানে পৌছানো নিশ্চিত করা এবং নিরাপত্তাজনিত কারণ ব্যতীত প্রতিমা পরিবহন রুট পরিবর্তন না করা; স্থানীয় প্রশাসন কর্তৃক নির্ধারিত স্থানে সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে বিসর্জন কার্যক্রম সমন্বয় করতে বলা হয়েছে।
নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা নেই
নিরাপত্তার বিষয়ে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, এবারের শারদীয় দুর্গাপূজায় নিরাপত্তা নিয়ে কোনো শঙ্কা নেই। প্রতিটি পূজামণ্ডপের নিরাপত্তায় সাতজন স্বেচ্ছাসেবী, আটজন আনসার সদস্য ছাড়াও পুলিশ, র্যাব ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা থাকবেন। এবারের পূজায় মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে ৮০ হাজার স্বেচ্ছাসেবী রাখা হচ্ছে।
গতকাল বুধবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের জেলা ম্যাজিস্ট্রেসি পরিবীক্ষণ শাখার সিনিয়র সহকারী সচিব নাহিদা আক্তার তানিয়ার সই করা বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে দুর্গাপূজা উপলক্ষে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিসহ সার্বিক বিষয়াদি নিবিড় পরিবীক্ষণের লক্ষ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং এতদসংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়/বিভাগ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। এ অবস্থায় উপর্যুক্ত সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে স্ব-স্ব অধিভুক্ত এলাকায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।
পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম বলেন, দুর্গাপূজা চলাকালে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় পুলিশের পোশাকের পাশাপাশি সাদাপোশাকে পুলিশ থাকবে। এ ছাড়া সোয়াট, ক্রাইম রেসপন্স টিম (সিআরটি) ও বোমা নিষ্ক্রিয়কারী ইউনিট সার্বক্ষণিক প্রস্তুত থাকবে। দুর্গাপূজা উপলক্ষে পুলিশ সদর দপ্তর এবং অন্যান্য পুলিশ ইউনিটে মনিটরিং সেল চালু থাকবে।
আইজিপি বলেন, দুর্গাপূজা উপলক্ষে পুলিশ পূজার আগে, পূজা চলাকালে এবং প্রতিমা বিসর্জন ও পূজা–পরবর্তী তিন স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। ইতিমধ্যে পূজাকেন্দ্রিক পুলিশের নিরাপত্তা কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
র্যাবের মহাপরিচালক ও অতিরিক্ত আইজিপি একেএম শহিদুর রহমান বলেন, দুর্গাপূজাকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে বিশৃঙ্খলা চেষ্টার পায়তারা চলছে। আমাদের আইসিটি বিভাগসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্ক রয়েছে। আমরা স্যোশাল মিডিয়া মনিটর করছি।
র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার ইন্তেখাব চৌধুরী গত বছর এবং তার আগের বছরগুলোতে যেসব মণ্ডপে ছোটবড় ঘটনা ঘটেছে তা মাথায় রেখে র্যাবের গোয়েন্দা তৎপরতা চালানো হচ্ছে। হিন্দু অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে অতিরিক্ত জনবল দিয়ে সব সময় টহলে রাখা হবে।
অ্যাপসে নজরদারি করবে আনসার-ভিডিপি
বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আনসার-ভিডিপি)পূজাকালীন দায়িত্বে থাকা দুই লক্ষাধিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সদস্য এবার প্রথমবারের মতো ‘শারদীয় সুরক্ষা অ্যাপস’ ব্যবহার করে মাঠপর্যায়ের ঘটনা তাৎক্ষণিকভাবে রিপোর্ট করবেন।
মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবদুল মোতালেব সাজ্জাদ মাহমুদ বলেন, পূজামণ্ডপগুলোকে নিরাপত্তা ঝুঁকির ভিত্তিতে তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। অধিক গুরুত্বপূর্ণ পূজামণ্ডপে আটজন, গুরুত্বপূর্ণ পূজামণ্ডপে ছয়জন এবং সাধারণ পূজামণ্ডপে ছয়জন করে আনসার-ভিডিপি সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। একইসঙ্গে দেশের ৬৪ জেলায় ৯২টি ব্যাটালিয়ন আনসার স্ট্রাইকিং ফোর্স টিম মোতায়েন থাকবে। প্রতিটি টিমে ছয়জন করে সদস্য থাকবেন, যারা নিয়মিত টহলের পাশাপাশি যেকোনো আপদকালীন পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকবেন।
মণ্ডপ ভিত্তিক নিরাপত্তা, থাকছে পৃথক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাও
ঢাকা মহানগরীতে ২৫৮টি মণ্ডপে পূজা অনুষ্ঠিত হবে। মণ্ডপভিত্তিক নিরাপত্তা পরিকল্পনার বাইরে পৃথক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাও থাকবে। এছাড়া প্রতিমা বিসর্জনের দিন সার্বিক নিরাপত্তা দেওয়া হবে।
ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এস এন মো. নজরুল ইসলাম বলেন, পূজামণ্ডপগুলোতে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের মাধ্যমে মণ্ডপের নিরাপত্তা বাড়াতে হবে। এ ছাড়া পূজা চলাকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেকোনো প্রকার ভুল তথ্য বা অপতথ্য সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে।
সুত্রঃ চ্যানেল আই