অমর একুশে, মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস আজ। রক্তস্নাত মাতৃভাষা আন্দোলনের ৭৪ বছর পূর্ণ হলো। রাজধানীসহ সারাদেশে যথাযোগ্য মর্যাদা ও ভাবগম্ভীর পরিবেশে দিবসটি পালিত হচ্ছে।
অমর একুশের প্রথম প্রহরে ভাষা শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। রাত ১২টা ১ মিনিটে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি শ্রদ্ধা জানান। তিনি শহীদ মিনার ত্যাগ করার পর রাত ১২টা ৮ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এবারই প্রথম শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন তিনি।
পুষ্পস্তবক অর্পণের পর প্রধানমন্ত্রী কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে ভাষা শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানান এবং তাঁদের রুহের মাগফিরাত কামনায় মোনাজাতে অংশ নেন। পরে মন্ত্রিসভার সদস্য ও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে আবারও শহীদ বেদিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর পর তিন বাহিনী প্রধানের পক্ষ থেকেও শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়।
বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানর নেতৃত্বে ১১ দলীয় ঐক্যের নেতারা শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানান। উল্লেখ্য, জামায়াতের পক্ষ থেকে এবারই প্রথম কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আনুষ্ঠানিকভাবে শ্রদ্ধা জানানো হয়।
দেশজুড়ে কর্মসূচি
আজ সরকারি ছুটির দিন। দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী পৃথক বাণী দিয়েছেন। সারাদেশে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সরকারি, আধা-সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়েছে।
আজিমপুর কবরস্থানে শহীদদের কবরে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ, কালো ব্যাজ ধারণ ও প্রভাতফেরি অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বাংলাদেশ বেতার, বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলগুলো বিশেষ অনুষ্ঠানমালা প্রচার করছে। সংবাদপত্রগুলোতেও প্রকাশিত হয়েছে বিশেষ ক্রোড়পত্র।
রক্তঝরা ইতিহাস
১৯৪৭ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বরে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকায় প্রথম ভাষা-বিক্ষোভ শুরু হয়। ১৯৪৮ সালের মার্চে সীমিত আকারে আন্দোলন হলেও ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ছাত্রসমাজ ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে রাজপথে নামে। পুলিশ গুলি চালালে সালাম, জব্বার, শফিক, বরকত ও রফিক শহীদ হন।
২২ ফেব্রুয়ারি প্রতিবাদে পুনরায় রাজপথে নামে সাধারণ মানুষ। মেডিকেল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে শহীদদের গায়েবি জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। ২৩ ফেব্রুয়ারি সেখানে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হলেও ২৬ ফেব্রুয়ারি তা ভেঙে দেয় তৎকালীন সরকার।
রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি
১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট জয়লাভের পর ৭ মে গণপরিষদে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ১৯৫৬ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি সংবিধানে সংশোধন এনে বাংলাকে পাকিস্তানের দ্বিতীয় রাষ্ট্রভাষা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। স্বাধীনতার পর ১৯৮৭ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদে ‘বাংলা ভাষা প্রচলন বিল’ পাস হয়, যা কার্যকর হয় ৮ মার্চ থেকে।
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কোর প্যারিস অধিবেশনে একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ২০০০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে দিবসটি বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে।
পরবর্তীতে ২০১০ সালের ২১ অক্টোবর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদর ৬৫তম অধিবেশনে প্রতিবছর ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালনের প্রস্তাব সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়।
বাঙালির প্রাণের এ দিনে আজও ধ্বনিত হচ্ছে সেই কালজয়ী গান— ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি?’