ছাত্রদের কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে গণঅভ্যুত্থান। সেই অভ্যুত্থানে সরকারের নির্দেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে নিভে যায় শত শত প্রাণ। এর বিনিময়ে অবিস্মরণীয় এক জয়ের দেখা পেয়েছে ছাত্র-জনতা। জনবিক্ষোভ দমাতে নির্বিচারে গুলি চালিয়েও শেষ রক্ষা হয়নি শেখ হাসিনার। অবশেষে যবনিকা ঘটল সাড়ে ১৫ বছরের একচ্ছত্র শাসনের। গতকাল সোমবার দুপুরে প্রধানমন্ত্রীর পদ ছেড়ে তিনি ছোট বোন শেখ রেহানাকে নিয়ে ভারতে উড়াল দেন। এর আগেই দেশজুড়ে কোটি মানুষ পথে নেমে বিজয় উল্লাসে মাতেন; নেন গণভবনের দখল।
আবু সাঈদের আত্মত্যাগের পথ ধরে শিক্ষার্থী, শ্রমিক, মজুরসহ শত শত মানুষ গত ২১ দিনে শাসকের বন্দুকের নলের সামনে বুকে পেতে দাঁড়ানোর নজিরবিহীন সাহস দেখান। বিরলতম এ আত্মত্যাগে বিজয়ী হয়েছে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান। উল্লাসে মাতোয়ারা সাধারণ মানুষ জানিয়েছেন, জনজোয়ারে ভেসে গেছে ক্ষমতার দম্ভ।
সরকারি চাকরিতে কোটা বাতিলের ২০১৮ সালের প্রজ্ঞাপন গত ৫ জুন হাইকোর্ট অবৈধ ঘোষণা করলে অসন্তোষের শুরু হয়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে গত ১ জুলাই থেকে শুরু হয় আন্দোলন। তৎকালীন সরকার হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের ঘোষণা দিলেও কৌশলে ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা ফেরত আনার চেষ্টা করছে অভিযোগ তুলে শিক্ষার্থীরা সরব হন।
গত ১৪ জুলাই সাবেক প্রধানমন্ত্রী গণভবনে সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্নের জবাবে আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকারের বাচ্চা’ আখ্যা দেন বলে দাবি করা হয়।
এতে ওই রাতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্লোগান ওঠে, ‘তুমি কে, আমি কে– রাজাকার, রাজাকার; কে বলেছে, কে বলেছে– স্বৈরাচার স্বৈরাচার’।
এ স্লোগানের জবাব দিতে ছাত্রলীগ প্রস্তুত– পরের দিন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এ কথা বলার এক ঘণ্টার মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর তাণ্ডব চালানো হয়। ছাত্রলীগের বহিরাগত নেতাকর্মী ছাত্রীদের মেরে রক্তাক্ত করে। এতে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে। গত ১৬ জুলাই রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ বুক পেতে দাঁড়ালে, নিরস্ত্র এ তরুণকে সরাসরি গুলি করে হত্যা করে পুলিশ। আন্দোলন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। ১৮ থেকে ২১ জুলাই নারকীয় বর্বরতা চলে বিক্ষোভকারীর ওপর। সমকালের হিসাবে এ চার দিনে ২১২ জনকে হত্যা করা হয়, যাদের অন্তত ১৯১ জন ছিলেন গুলিবিদ্ধ। প্রাণ হারান আবু সাঈদের পথে অনুপ্রাণিত অন্তত ৫০ শিক্ষার্থী। শিক্ষার্থীদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে পথে নামা শত সাধারণ মানুষ নিহত হন। হাজার হাজার মানুষ গুলিবিদ্ধ হন।
সে সময়ে বিভিন্ন সরকারি স্থাপনায় হামলার জন্য সরকার বিএনপি-জামায়াতকে দায়ী করে; শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনার প্রস্তাব দেয়। ২১ জুলাই আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায়ও বাতিল করে। তবে ততদিনে শিক্ষার্থীরা সোচ্চার হন গ্রেপ্তার-হয়রানির বিরুদ্ধে। শেখ হাসিনার ক্ষমা প্রার্থনা, দুই মন্ত্রীর পদত্যাগসহ ৯ দাবি তোলেন। কিন্তু আওয়ামী লীগ এতে রাজি না হলে শনিবার বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন সরকার পতনের এক দফা ঘোষণা করে। এ ঘোষণার দু’দিনের মাথায় পতন হয়েছে শেখ হাসিনার।
গত ৭ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনে জয়ী হয়ে টানা চতুর্থবারের মতো ক্ষমতায় এসেছিল আওয়ামী লীগ। বিএনপিসহ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো ২০১৫ সাল থেকে কয়েকবার সরকার পতনের এক দফা আন্দোলন করেও শেখ হাসিনাকে টলাতে পারেনি। তাঁর সরকারের পতন হতে পারে, তা কয়েক দিন আগেও ভাবেননি কেউ।
গত রোববার ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে রক্তঝরা দিন। সেদিন শতাধিক প্রাণ ঝরলেও গতকাল সকালে ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে লাখো ছাত্র-জনতা রাজধানীর প্রবেশপথে অবস্থা নেন। শেষ সময়েও বিক্ষোভ দমনে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে শেখ হাসিনা সরকার।
ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার হাবিবুর রহমান আগের রাতেই হুঁশিয়ার দিয়েছিলেন, কারফিউ ভেঙে জমায়েত হলে আইনের সর্বোচ্চ প্রয়োগ করা হবে। কিন্তু আগের দিনগুলোর মতোই হুমকিতে না দমে বেলা ১১টার দিকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে জমায়েত হতে শুরু করেন বিক্ষোভকারীরা। সাড়ে ১১টার দিকে গুলি করে জমায়েত ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে পুলিশ। একই সময়ে যাত্রাবাড়ী, উত্তরা, মোহাম্মদপুর, রামপুরা, বাড্ডায় আন্দোলনকারীদের বুলেট ছুড়ে ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করা হয়। এতে অনেকেই নিহত হন গতকাল। বন্ধ করা হয় ইন্টারনেট।
সেনাবাহিনী একই সময়ে দায়িত্বে থাকলেও বিক্ষোভকারীদের দমন করেনি। তবে দুপুর ১২টার দিকে সেনাসদস্যরা সড়ক থেকে সরে যেতে শুরু করেন। হঠাৎ পুলিশও সরে যেতে থাকে। সেই সময়ে আইএসপিআরের বরাতে গণমাধ্যমে খবর হয়, সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান দুপুর ২টায় জনগণের উদ্দেশে বক্তব্য দেবেন। সেই সময় পর্যন্ত সবাইকে ধৈর্য ধারণের আহ্বান জানানো হয়।
এ খবরে অনেকটাই নিশ্চিত হয়ে যায়, প্রধানমন্ত্রী পদে শেখ হাসিনা আর থাকতে পারছেন না। এতে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে বিভিন্ন সড়ক হয়ে লাখো মানুষ জমায়েত হতে শুরু করেন শাহবাগে। তখনও সড়কে পুলিশ, বিজিবি ও আনসার সদস্যরা অস্ত্র হাতে ছিলেন।
দুপুর ২টা ৩৫ মিনিটে শেখ হাসিনাকে বহনকারী বিমানবাহিনীর হেলিকপ্টার গণভবন থেকে ভারতের আগরতলার উদ্দেশে যাত্রা করে। ঠিক একই সময় তাঁর ধানমন্ডির রাজনৈতিক কার্যালয় এবং ব্যক্তিগত বাসভবন সুধা সদন থেকে পুলিশ, বিজিবি সদস্যরা সরে যায়। তখন আওয়ামী লীগ কার্যালয় থেকে কয়েকজন নেতাকর্মী, কর্মকর্তা-কর্মচারীকে দৌড়ে বের হতে দেখা যায়। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে ধানমন্ডি এলাকায় সড়কে উল্লাসকারীর জনস্রোত নামে।
সাধারণ মানুষ জানান, শেখ হাসিনার টানা সাড়ে ১৫ বছরের শাসনে নানা বঞ্চনার কথা। মিরপুর সড়কে উল্লাস করা আইডিয়াল কলেজের শিক্ষার্থী কাজী আবু বারেক সমকালকে বলেন, ২০১৪ সালে ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচন এবং ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের রাতের ভোটের মাধ্যমে জনগণের সব অধিকার কেড়ে নিয়েছিলেন শেখ হাসিনা। কেউ কথা বললেই ‘বিএনপি-জামায়াত’ তকমা দিয়ে নির্যাতন করা হয়েছে। বিএনপি-জামায়াত সমর্থক– শুধু এই সন্দেহে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে। এসব ক্ষোভ থেকে আন্দোলনে শামিল হয়েছিলেন।
মীর মোস্তাক আহমেদ নামের আরেক ব্যক্তি বলেন, ভোটাধিকার না থাকা, কথা বললেই আওয়ামী লীগ ও পুলিশের হয়রানি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, শেখ হাসিনার ক্ষমতার দম্ভ, আওয়ামী লীগ নেতাদের চাটুকারিতা ও বিরোধীদের ওপর সব দোষ চাপানো, জনগণকে স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের সুযোগ না দেওয়া, দুর্নীতি, সুশাসনের অভাবসহ নানা কারণে সাধারণ মানুষ এমনিতে ক্ষুব্ধ ছিলেন। আবু সাঈদকে হত্যার পর ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে। বিএনপিসহ অন্য দলের আন্দোলনে সাড়া না দিলেও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে এবার দলে দলে জনতা নেমে আসে। ১৮ থেকে ২১ জুলাইয়ের গণহত্যার পর মানুষ আর শেখ হাসিনাকে কোনোভাবেই গণভবনে মানতে পারছিলেন না।
আওয়ামী লীগ সভাপতির পদত্যাগের ঘোষণার পর সেই ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ দেখা যায়। তাঁর হেলিকপ্টার গণভবন থেকে উড়াল দেওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যে সেখানে হাজারো মানুষের ঢল নামে। চলে লুটপাট। প্রধানমন্ত্রীর শয়ন কক্ষে ঢুকে যান বহু মানুষ। গণভবন থেকে সব আসবাব নিয়ে যান। ঢল ঢুকে যায় সংসদ ভবনেও। গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয়সহ সব কার্যালয়।
বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিবিজড়িত ধানমন্ডি ৩২-এ চলে বর্বরতা। হামলা হয় আওয়ামী লীগ নেতাদের বাড়িতে। মন্ত্রীদের বাড়িতে চলে লুটপাট। তাণ্ডব চলে প্রধান বিচারপতির বাসভবনেও। এতে বহু মানুষের প্রাণ গেছে গতকালও।
একই সময়ে পথে পথে গান গেয়ে, স্লোগান দিয়ে উল্লাস করেন লাখো মানুষ, যারা আন্দোলনের মূল শক্তি ছিলেন। তারা জাতীয় পতাকা, সংগীতের প্রতি সম্মান দেখান। এই সাধারণ মানুষ সতর্ক করেছেন, নতুন যে সরকার আসতে যাচ্ছে, তারা যদি লুটপাটে যুক্তদের দমন না করে, তাহলে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান ব্যর্থ হবে।