সংগীতশিল্পী ও অভিনেত্রী কনি ফ্রান্সিস, যিনি সম্প্রতি ৮৭ বছর বয়সে মারা গেছেন। তার সবচেয়ে জনপ্রিয় গান ‘প্রিটি লিটল বেবি’-তে গেয়েছিলেন, ‘তুমি কি জানো না, যখন হৃদয়ে উচ্ছ্বলতা থাকে, তখন ভালোবাসা হয় অনেক বেশি মধুর?’ অথচ নিজের জীবনের বাস্তবতা ছিল ঠিক তার উল্টো— ভালোবাসার বদলে তিনি পেয়েছেন বিপর্যয়, আঘাত আর শোকের এক দীর্ঘ তালিকা।
নিউ জার্সির নিউয়ার্কে ইতালিয়ান-আমেরিকান পরিবারে জন্ম নেওয়া কনকেটা ফ্রাঙ্কোনেরো, ছোটবেলা থেকেই প্রতিভাবান ছিলেন। ১৯৫৩ সালে ‘স্টারটাইম কিডস’ নামে একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠানে প্রথম সুযোগ পান। তখনও তার নাম ছিল কনি ফ্রাঙ্কোনেরো। পরবর্তীতে কনি ফ্রান্সিস নামে পরিচিত হয়ে ওঠেন তিনি।
তার ক্যারিয়ারে বড় সাফল্য আসে ১৯৫৭ সালে ‘হুস সরি নাউ’ গান দিয়ে, যা যুক্তরাজ্যের সিঙ্গেল চার্টের শীর্ষে ওঠে এবং এক মিলিয়নের বেশি কপি বিক্রি হয়। এরপর তার আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ক্যারিয়ার হয় আকাশছোঁয়া! ভাষাগত দক্ষতায় তিনি গান গেয়েছেন ইয়িদ্দিশসহ নানা ভাষায়। ১৯৬২ সালে প্রকাশিত হয় তার সিগনেচার হিট গান ‘প্রিটি লিটল বেবি’— একটি প্রাণবন্ত, আনন্দময় গান, যা বাস্তব জীবনের কনির সাথে ছিল একেবারেই বিপরীত।
তবে তার জীবনের প্রথম ট্র্যাজিক মোড় আসে যখন তিনি প্রেমে পড়েন বিখ্যাত গায়ক ববি ড্যারিনের। ড্যারিন তাকে গান লেখার প্রস্তাব দেন এবং দুজনের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে। কিন্তু কনির কট্টর ক্যাথলিক পিতা সেটা মানতে না পেরে বন্দুক হাতে স্টুডিওতে গিয়ে ড্যারিনকে তাড়িয়ে দেন। এই বিচ্ছেদকেই কনি পরবর্তীতে জীবনের সবচেয়ে বড় দুঃখ বলে বর্ণনা করেন।
১৯৬৪ সালে দুনিয়াজুড়ে সংগীতের রুচি বদলাতে থাকে—দ্য বিটলস ও অনুরূপ ব্যান্ডদের আবির্ভাবে কনির জনপ্রিয়তা কমতে থাকে। সত্তরের দশকে তিনি আবার চেষ্টা করেন, কিন্তু ১৯৭৪ সালে নিউ ইয়র্কের এক মোটেলে ধর্ষণের শিকার হন। হামলাকারী কখনো ধরা পড়েনি। যদিও কনি ওই মোটেল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে মামলা করে ২০ লাখ পাউন্ড ক্ষতিপূরণ পান এবং এই ঘটনার পরে মোটেল নিরাপত্তা ব্যবস্থা উন্নত হয়, কিন্তু মানসিকভাবে তিনি ভেঙে পড়েন। সেই ঘটনার পর তিনি গা ঢাকা দেন, ওষুধের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন, এবং অনেক বছর আত্মগোপনে থাকেন।
১৯৮১ সালে আবার আরেকটি ভয়াবহ ট্র্যাজেডি ঘটে তার জীবনে। তার ভাই জর্জ ফ্রাঙ্কোনেরো জুনিয়রকে মাফিয়া সদস্যরা হত্যা করে। কারণ তিনি এফবিআইকে সংগঠিত অপরাধ সংক্রান্ত তথ্য দিয়েছিলেন। এই মৃত্যু কনিকে গভীর মানসিক সঙ্কটে ফেলে দেয়।
এর কিছুদিন পর পিটিএসডি এবং মানসিক রোগ ধরা পড়ে। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন—“আমি পাঁচ বছরে ১৭ বার মানসিক হাসপাতালে ভর্তি হয়েছি। ভুলভাবে আমাকে বায়পোলার, এডিএইচডি, এডিডিসহ নানান রোগে আক্রান্ত বলে নির্ণয় করা হয়েছিল।” লিথিয়াম দিয়ে চিকিৎসা শুরু হলেও সেটা তাকে ‘জোম্বি’র মতো করে তোলে।
১৯৮৪ সালে তিনি আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। তবে বেঁচে যান এবং একই বছর ‘হুস সরি নাউ’ নামে আত্মজীবনী প্রকাশ করেন, যেখানে অকপটে নিজের জীবনের দুঃখ-কষ্ট তুলে ধরেন। এই সময় তার তিনটি বিয়ের কথাও জানান, যেগুলো ছিলো স্বল্পস্থায়ী। সেই সময়ে একটি চলচ্চিত্র প্রকল্পও হাতে নেন তিনি। যেটিতে গ্লোরিয়া এস্তেফান কনির চরিত্রে অভিনয় করার কথা ছিল। কিন্তু তা বাস্তবায়িত হয়নি। এমনকি ডলি পার্টনও কনির জীবন নিয়ে সিনেমা বানাতে চেয়েছিলেন, কিন্তু এস্তেফান প্রকল্পের কারণে সেটাও আটকে যায়।
কনি ছিলেন রক্ষণশীল; তিনি কখনোই চাননি তার গান যৌন বা অশ্লীল দৃশ্যে ব্যবহৃত হোক। জোব্রেকার (১৯৯৯) ছবিতে তার গান ‘ললিপপ লিপস’ ব্যবহারের বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন, যদিও হেরে যান কারণ তার গানগুলোর স্বত্বাধিকার তার নিজের ছিল না।
রাজনৈতিকভাবে নিজেকে ‘ডাই-হার্ড লিবারাল’ বললেও রোনাল্ড রিগানের অধীনে অপরাধ দমন সংক্রান্ত একটি টাস্কফোর্সে কাজ করেছেন এবং ১৯৬৮ সালে রিচার্ড নিক্সনের জন্য প্রচারণা সংগীতও গেয়েছেন, গানটি হলো ‘নিক্সনস দ্য ওয়ান’!
২০১৮ সালে অবসর নেওয়ার আগে তিনি আরেকটি স্মৃতিকথা প্রকাশ করেন, যেটির নাম ‘আমং মাই সুভিনিয়রস’। তার জীবনের এক বিস্ময়কর বাঁক আসে তখন, যখন টিকটকে ‘প্রিটি লিটল বেবি’ গানটি ভাইরাল হয়ে যায়। তিনি মজা করে বলেছিলেন—“সত্যি বলতে আমি গানটাই মনে করতে পারছিলাম না… কিন্তু ভাবতে ভালো লাগে যে ৬৩ বছর আগে করা একটি গান আজও এত মানুষকে ছুঁয়ে যাচ্ছে।”