ভোরের আলো ফুটতেই ব্যস্ত হয়ে ওঠে কালীগঞ্জ উপজেলার নলতা। ফজরের নামাজ শেষ হতেই শুরু হয় বিশাল কর্মযজ্ঞ—লক্ষ্য প্রতিদিন ৬ হাজার মানুষের জন্য ইফতার প্রস্তুত করা।
ঐতিহ্যবাহী নলতা কেন্দ্রীয় আহ্ছানিয়া মিশন প্রাঙ্গণে রমজান মাসজুড়ে প্রতিদিন এমন আয়োজন করা হয়। বড় বড় কড়াইয়ে ছোলা রান্না, ডেকে ডেকে ফিরনি তৈরি, আর সারি সারি সিঙ্গারা ভাজার দৃশ্য—সব মিলিয়ে সকাল থেকেই জমে ওঠে রান্নাঘর।
২৫ বছর ধরে ইফতার প্রস্তুতের দায়িত্বে থাকা বাবুর্চি আমানত আলী জানান, প্রতিদিন ১৯০ কেজি ছোলা রান্না করা হয়। ১৪৪ কেজি সুজি, ১৫০ কেজি চিনি ও ৬০০ কেজি দুধ দিয়ে সাত ডেক ফিরনি তৈরি করা হয়। ভোর থেকে কাজ শুরু করে বিকেল তিনটার মধ্যে প্রস্তুতি শেষ করতে হয়। এখান থেকে পাওয়া পারিশ্রমিকেই তার সংসার চলে বলে জানান তিনি।
সিঙ্গারা তৈরির কাজে নিয়োজিত মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ৫-৬ জনের একটি দল ভোর ৬টা থেকে কাজ শুরু করেন। ১৮০ কেজি আলু কাটা হয়, ১৫৪ কেজি ময়দার খামির তৈরি করা হয়। সীমিত পারিশ্রমিক হলেও ধর্মীয় পরিবেশে কাজ করতে পেরে তারা তৃপ্ত।
প্রতিদিন প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ স্বেচ্ছাসেবক প্লেট সাজানো ও খাবার বিতরণে অংশ নেন। খেজুর, কলা, চিড়া, ছোলা ও ফিরনি দিয়ে সাজানো হয় প্রতিটি ইফতার প্লেট।
২০ বছর ধরে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে যুক্ত মোহাম্মদ নাজমুল হাসান বলেন, নলতা শরীফে প্রতিবছরের মতো এবারও পহেলা রমজান থেকে ৩০ রমজান পর্যন্ত প্রতিদিন ৬ হাজার মানুষের ইফতার আয়োজন করা হচ্ছে। তিনি জানান, প্রায় দুই দশক ধরে এই সেবামূলক কাজে যুক্ত থাকতে পেরে তিনি গর্বিত।
অনেক বছর ধরে এখানে ইফতার করছেন আনসার আলী। তার ভাষ্য, “এখানে এসে শান্তি লাগে। নামাজ-কালাম আর ইফতার মিলিয়ে এক সুন্দর পরিবেশ তৈরি হয়। সবাই মিলেমিশে একসঙ্গে ইফতার করি।”
মিশনের সাধারণ সম্পাদক কৃষিবিদ ডা. মো. নজরুল ইসলাম জানান, প্রতিদিন প্রায় ২ লাখ ৬০ হাজার টাকা ব্যয়ে এই আয়োজন পরিচালিত হয়। দেশ-বিদেশের ভক্ত ও দাতাদের অনুদানে অর্থ সংগ্রহ হয়। প্রায় ৫০ জন বাবুর্চি ও ২৫০ ভলান্টিয়ার নিরলসভাবে কাজ করেন।
জানা যায়, সাধক খান বাহাদুর আহছানউল্লাহ (র.) ১৯৩৫ সালে নলতায় এই মিশন প্রতিষ্ঠা করেন। শুরুতে স্থানীয়রা নিজ নিজ বাড়ি থেকে রান্না করা খাবার এনে একসঙ্গে ইফতার করতেন। সময়ের সঙ্গে সেই ছোট আয়োজন আজ ৬ হাজার মানুষের মিলনমেলায় রূপ নিয়েছে।
প্রথম রোজা থেকে শুরু হওয়া এই ইফতার মাহফিল চলবে পুরো রমজানজুড়ে। নলতার প্রতিদিনের এই আয়োজন যেন সম্প্রীতি ও একতার এক জীবন্ত উদাহরণ।