২০২৬ সালের শুরুতেই চীনের অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান বিশ্ব অর্থনীতিকে নতুন করে নাড়িয়ে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘদিনের শুল্ক যুদ্ধ সত্ত্বেও দেশটির রপ্তানি কমার বদলে বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। ২০২৫ সালে চীনের বার্ষিক বাণিজ্য উদ্বৃত্ত দাঁড়িয়েছে রেকর্ড ১ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বৈশ্বিক ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
এই তথ্য প্রকাশের পরদিনই নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত এক নিবন্ধে সতর্কবার্তা দেন কর্নেল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ও ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের সিনিয়র ফেলো ঈশ্বর প্রসাদ। তিনি বলেন, মুক্ত বাণিজ্য ব্যবস্থার জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরোপিত শুল্কের চেয়েও বড় ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে চীনের এই বিশাল বাণিজ্য উদ্বৃত্ত।
উন্নয়নশীল দেশগুলোও চাপে
অধ্যাপক প্রসাদের মতে, চীনের স্বল্পমূল্যের পণ্য শুধু উন্নত দেশগুলোর উৎপাদন খাতের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে না, বরং নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর জন্যও প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে।
তিনি লেখেন,
“বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ হয়েও অন্য দেশগুলোর ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল এই প্রবৃদ্ধি বৈশ্বিক নিয়মভিত্তিক বাণিজ্য ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিচ্ছে।”
চীনের ভিন্ন ব্যাখ্যা
তবে এই উদ্বৃত্তকে ভিন্নভাবে দেখছে বেইজিং। চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদমাধ্যম গ্লোবাল টাইমসের সাবেক প্রধান সম্পাদক হু সিজিন ১৬ জানুয়ারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম উইবোতে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, এই বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকদের আতঙ্কিত করে তুলেছে।
তার ভাষায়,
“চীনের অর্থনীতি প্রমাণ করেছে—কোনো শুল্ক যুদ্ধ দিয়েই একে দমিয়ে রাখা সম্ভব নয়।”
তিনি আরও বলেন, চীনের পণ্য রপ্তানি কোনো সামরিক শক্তির জোরে নয়; বরং সততা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার ফল।
কেন বাড়ছে উদ্বৃত্ত
বিশ্লেষকদের মতে, রেকর্ড উদ্বৃত্তের পেছনে রয়েছে দুটি প্রধান কারণ—
একদিকে শক্তিশালী রপ্তানি প্রবাহ, অন্যদিকে দুর্বল আমদানি।
২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে চীনের রপ্তানি প্রায় ২০ শতাংশ কমলেও, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা, আসিয়ান এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নে রপ্তানি বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। এর মধ্যে আফ্রিকায় রপ্তানি বৃদ্ধি পেয়েছে ২৫ দশমিক ৮ শতাংশ, যা ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
ইউয়ানের অবমূল্যায়ন, উৎপাদন খাতে মুদ্রাসঙ্কোচন এবং বৈশ্বিক বাজারে শক্তিশালী চাহিদা চীনা পণ্যকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলেছে।
আমদানিতে স্থবিরতা
২০২৫ সালে চীনের মোট আমদানি বেড়েছে মাত্র ০ দশমিক ৫ শতাংশ, যেখানে রপ্তানি বেড়েছে ৬ দশমিক ১ শতাংশ। এই বড় ব্যবধানের মূল কারণ দেশটির অভ্যন্তরীণ চাহিদার দুর্বলতা।
গত বছরের দ্বিতীয়ার্ধে ভোক্তা পণ্যের খুচরা বিক্রির প্রবৃদ্ধি নেমে আসে তিন বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন ১ দশমিক ৩ শতাংশে। পাশাপাশি আবাসন খাতের সংকটে স্থায়ী সম্পদে বিনিয়োগও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, ১৯৯৮ সালের পর এই প্রথম চীনে বার্ষিক বিনিয়োগে পতন ঘটতে যাচ্ছে।
বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রভাব
২০২৫ সালের সাতটি মাসেই চীনের মাসিক বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ১০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়, যা আগের বছরের তুলনায় বহুগুণ বেশি। এটি প্রমাণ করে যে বিষয়টি কোনো সাময়িক ঘটনা নয়।
একদিকে এই উদ্বৃত্ত চীনের উৎপাদন সক্ষমতার শক্তিশালী অবস্থান তুলে ধরছে। কম দামে পণ্য সরবরাহের মাধ্যমে এটি বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণেও ভূমিকা রাখছে।
অন্যদিকে অতিরিক্ত রপ্তানিনির্ভরতা চীনের অর্থনীতিতে কাঠামোগত ভারসাম্যহীনতা তৈরি করছে, যা ভবিষ্যতে বাণিজ্য অংশীদারদের সঙ্গে নতুন উত্তেজনার জন্ম দিতে পারে।
পাল্টা শুল্কের আশঙ্কা
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা ইতোমধ্যে সতর্ক করে বলেছেন, চীন যদি রপ্তানিনির্ভর প্রবৃদ্ধি মডেল থেকে সরে না আসে, তাহলে বৈশ্বিক বাণিজ্যে উত্তেজনা বাড়বে।
ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁও ইঙ্গিত দিয়েছেন, ভারসাম্যহীনতা অব্যাহত থাকলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন চীনা পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপে বাধ্য হতে পারে।
ভারসাম্যের পথে বেইজিং
চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াং চলতি মাসে গুয়াংডং সফরে বলেন, আমদানি বাড়িয়ে রপ্তানি-আমদানির মধ্যে ভারসাম্য আনাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য।
বাণিজ্যমন্ত্রী ওয়াং ওয়েনতাও জানিয়েছেন, ২০২৬ সালে সমন্বিত বাণিজ্য মেলা ও লক্ষ্যভিত্তিক ক্রয়ের মাধ্যমে আমদানি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এরই অংশ হিসেবে সরকার ঘোষণা দিয়েছে—
-
এপ্রিল থেকে সৌরবিদ্যুৎ পণ্যে রপ্তানি ভ্যাট রিবেট বাতিল
-
ব্যাটারি খাতে কর ছাড় ধাপে ধাপে প্রত্যাহার
-
ইইউর সঙ্গে বৈদ্যুতিক গাড়ি শুল্ক ইস্যুতে সমঝোতা
আশীর্বাদ না অভিশাপ?
চীনের এই রেকর্ড বাণিজ্য উদ্বৃত্ত শেষ পর্যন্ত আশীর্বাদ নাকি অভিশাপ হয়ে উঠবে—তা নির্ভর করছে রপ্তানি আয়ের কতটা দেশটির অভ্যন্তরীণ বাজারে বিনিয়োগ হয় এবং আমদানি বৃদ্ধির মাধ্যমে বৈশ্বিক ভারসাম্য কতটা ফিরিয়ে আনা যায় তার ওপর।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাস্তবতা হু সিজিনের অতিরিক্ত আশাবাদ কিংবা অধ্যাপক প্রসাদের চরম আশঙ্কা—কোনোটির দিকেই পুরোপুরি ঝুঁকছে না। তবে একথা নিশ্চিত, এই উদ্বৃত্ত আগামী দিনে বৈশ্বিক বাণিজ্য রাজনীতির অন্যতম বড় আলোচনার কেন্দ্রে থাকবে।
সূত্র: বিজনেস টাইমস