মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধে বাংলাদেশ সরকারের প্রণীত মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর প্রতি সমর্থন জানিয়েছে ইতালি, জার্মানি, যুক্তরাজ্য ও নেদারল্যান্ডসের দূতাবাস।
বুধবার প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে এসব দেশের রাষ্ট্রদূত ও কূটনৈতিক প্রতিনিধিরা অধ্যাদেশটির প্রতি সমর্থন প্রকাশ করেন। বৃহস্পতিবার সকালে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানায়।
বৈঠকে স্পেশাল ব্রাঞ্চ ও অপরাধ তদন্ত বিভাগের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের পাশাপাশি জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা, জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
ভুয়া ভিসা আবেদনসংক্রান্ত জটিলতার মূল কারণ মোকাবিলায় অন্তর্বর্তী সরকার এই অধ্যাদেশ প্রণয়ন করেছে। এতে ভুয়া নথি ব্যবহার, অভিবাসী চোরাচালান এবং এ ধরনের অপরাধে সহায়তাকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।
বৈঠকে জানানো হয়, সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত বাংলাদেশ ভুয়া নথি ব্যবহার রোধে যথেষ্ট কার্যকর নয়—এমন একটি ধারণা বিদেশি কূটনৈতিক মহলে তৈরি হয়েছিল। এর ফলে পারস্পরিক আস্থার ঘাটতি তৈরি হয় এবং ভিসা প্রক্রিয়াকরণে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। দেশে ও বিদেশে সক্রিয় অসাধু দালালচক্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে প্রতারণা চালালেও অতীতে এসব ঘটনায় মামলা ও বিচারিক কার্যক্রম ছিল সীমিত।
বৈঠকে কয়েকটি উদাহরণ তুলে ধরা হয়। একটি দূতাবাস জানায়, তারা ৬০০টির বেশি ভিসা আবেদন পেয়েছে, যেখানে ভুয়া চাকরির প্রস্তাবপত্র সংযুক্ত ছিল। আরেকটি দূতাবাস একই এলাকা থেকে ৩০০টি পর্যটন ভিসার আবেদন পায়, যেখানে একই ব্যাংকের ভুয়া আর্থিক বিবরণী ব্যবহার করা হয়। অন্য একটি ঘটনায় একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক পেজের মাধ্যমে ৭০ জনের কাছ থেকে কয়েক লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার তথ্য উঠে আসে।
এসব ঘটনায় বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মামলা ও বিচারিক কার্যক্রম জোরদার করেছে বলে বৈঠকে জানানো হয়। আলোচনায় বলা হয়, গত বছর গড়ে প্রতিদিন ৪০ জনের বেশি যাত্রীকে ইমিগ্রেশন পুলিশ বিমানবন্দর থেকে ফেরত পাঠিয়েছে।
ভিসা-অন-অ্যারাইভাল সুবিধা দেওয়া বিমানবন্দরগুলো তৃতীয় দেশে অবৈধ যাত্রার ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় আসে। একটি দেশ জানায়, গত বছর তারা বাংলাদেশি নাগরিকদের কাছ থেকে ৬ হাজারের বেশি আশ্রয় আবেদন পেয়েছে, যাঁরা মূলত শিক্ষার্থী বা কর্মভিসায় দেশটিতে প্রবেশ করেছিলেন।
আস্থার ঘাটতির কারণে কিছু দেশে বাংলাদেশি নথিপত্র যাচাইয়ে ভিসা প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হচ্ছে বলেও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। একটি দেশ চলমান তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সাময়িকভাবে ভিসা আবেদন গ্রহণ স্থগিত রেখেছে বলে বৈঠকে জানানো হয়।
ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে ব্যাংক বিবরণী যাচাই সহজ করতে ইউনাইটেড কমার্শিয়িয়াল ব্যাংকের কিউআর কোড চালুর উদ্যোগের প্রশংসা করা হয় এবং এটি পুরো ব্যাংক খাতে সম্প্রসারণের আহ্বান জানানো হয়।
আন্তর্জাতিক অপরাধ দমনে সমন্বয় জোরদারে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়সংক্রান্ত সাম্প্রতিক অগ্রগতির কথাও আলোচনায় উঠে আসে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের রিটার্নি কেস ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিগত সহায়তা আরও কার্যকরভাবে ব্যবহারের বিষয়টি তুলে ধরা হয়। তবে অভিবাসন বিষয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের দ্রুত বদলিকে একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
বিএমইটি জানায়, তাদের অধিকাংশ কার্যক্রম এখন স্বয়ংক্রিয় এবং ইমিগ্রেশন পুলিশের সঙ্গে সংযুক্ত। এর ফলে প্রথমবারের মতো বিএমইটি কার্ডধারীদের বিদেশ যাওয়া ও দেশে ফেরার তথ্য পর্যবেক্ষণ সম্ভব হচ্ছে।
আলোচনায় আরও বলা হয়, মূল রিক্রুটিং এজেন্টরা নিবন্ধিত ও নিয়ন্ত্রিত হলেও স্থানীয় পর্যায়ের সাব-এজেন্টরা এখনও অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণের বাইরে রয়েছে। দালালচক্রের অপব্যবহার সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়।
এ ছাড়া হেগ অ্যাপোস্টিল কনভেনশনে বাংলাদেশের যোগদান নিয়েও আলোচনা হয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে ইস্যু করা অ্যাপোস্টিল নথির উৎস ও বিষয়বস্তুর নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
বৈঠকের শেষে অংশগ্রহণকারীরা মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধে এসব উদ্যোগ স্বচ্ছতার সঙ্গে বাস্তবায়নে অন্তর্বর্তী সরকারের দৃঢ় অবস্থান ও অঙ্গীকারের প্রশংসা করেন। পশ্চিমা দেশগুলোর কূটনৈতিক প্রতিনিধিরা বাংলাদেশের সহযোগিতাকে অভূতপূর্ব বলে উল্লেখ করেন।
সুত্রঃবাসস