রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগকে সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে মিয়ানমার। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে দেশটি দাবি করেছে, রাখাইনে পরিচালিত সামরিক অভিযান কোনোভাবেই গণহত্যা নয়; বরং তা ছিল বিদ্রোহী গোষ্ঠীর হামলার জবাবে পরিচালিত একটি বৈধ নিরাপত্তা অভিযান।
শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে শুনানিকালে মিয়ানমারের প্রতিনিধি কো কো হ্লাইং এ দাবি করেন। তিনি বলেন, ২০১৭ সালে রাখাইন রাজ্যে সংঘটিত অভিযান ছিল সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রমের অংশ। গাম্বিয়ার আনা গণহত্যার অভিযোগকে ভিত্তিহীন উল্লেখ করে তিনি দাবি করেন, অভিযোগ প্রমাণে পর্যাপ্ত ও গ্রহণযোগ্য তথ্য উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হয়েছে গাম্বিয়া।
সোমবার (১২ জানুয়ারি) থেকে শুরু হওয়া এই শুনানিতে মিয়ানমার সরকার আদালতে তাদের সামরিক পদক্ষেপকে আইনসম্মত হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
এর আগে জাতিসংঘ ও একাধিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা রাখাইনে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অভিযানকে ‘জাতিগত নির্মূল’ ও ‘গণহত্যার উদ্দেশ্যে পরিচালিত সহিংসতা’ হিসেবে অভিহিত করে। জাতিসংঘের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই অভিযানে প্রায় ১০ হাজার মানুষ নিহত হন। পাশাপাশি ব্যাপক যৌন নিপীড়ন, বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়া এবং নির্বিচারে সহিংসতার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
এই সহিংসতার মুখে প্রাণ বাঁচাতে ৭ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। এসব ঘটনার প্রেক্ষাপটে ২০১৯ সালে ইসলামী সহযোগিতা সংস্থার সমর্থনে আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়া আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার মামলা দায়ের করে।
শুনানিতে গাম্বিয়ার বিচারমন্ত্রী দাউদা জাল্লো বলেন, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যেই মিয়ানমার দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পিত নিপীড়ন চালিয়ে আসছে। তবে মিয়ানমারের প্রতিনিধি কো কো হ্লাইং এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, জাতিসংঘের তদন্ত মিশনের প্রতিবেদন অভিযোগ প্রমাণের প্রয়োজনীয় মানদণ্ড পূরণ করে না।
নেইপিদোর দাবি, গাম্বিয়ার উপস্থাপিত নথিপত্র অসম্পূর্ণ ও ত্রুটিপূর্ণ। বিশ্লেষকদের মতে, এই মামলার মাধ্যমে মিয়ানমার মূলত আন্তর্জাতিক চাপ ও সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞা থেকে নিজেদের অবস্থান জোরালো করার চেষ্টা করছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই মামলার রায় কেবল মিয়ানমারের জন্য নয়; বরং আন্তর্জাতিক রাজনীতির ক্ষেত্রেও তা গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে গাজা যুদ্ধ নিয়ে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে দায়ের করা মামলার ক্ষেত্রেও এই রায়ের পর্যবেক্ষণ তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারে।
এদিকে গাম্বিয়া দাবি করছে, বিচার প্রক্রিয়ায় বিলম্ব হলে রোহিঙ্গাদের ন্যায়বিচার প্রাপ্তি বাধাগ্রস্ত হবে। অন্যদিকে মিয়ানমার এই মামলাকে তাদের সার্বভৌমত্বে হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখছে এবং আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।