ঢাকায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমান বিধ্বস্ত হয়ে শিশুদের হতাহতের মর্মান্তিক ঘটনার পরবর্তী পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকার সমন্বয়হীনতা ও ব্যর্থতার নজির স্থাপন করেছে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করেন।
এই ঘটনায় সরকারের সক্ষমতা নিয়ে যেমন প্রশ্ন উঠেছে, একইসঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে–– জনবহুল এলাকায় কেন যুদ্ধবিমান চালানোর প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে এবং ঘটনার দায় কার?
একসঙ্গে এত শিশুর মৃত্যু কমই দেখেছে বাংলাদেশ। গত সোমবার যুদ্ধবিমান প্রশিক্ষণের সময় বিধ্বস্ত হয়ে স্কুলটিতে আছড়ে পড়লে শিশুদের র্মমান্তিক মৃত্যু ও হতাহতের ঘটনা দেশজুড়ে মানুষের মাঝে আবেগ সৃষ্টি করে।
কিন্তু পরবর্তী পরিস্থিতি সামলাতে সরকার যে সব পদক্ষেপ নেয়, প্রতিটি পদক্ষেপ নিয়েই প্রশ্ন ওঠে এবং নানা আলোচনার জন্ম দেয় বলে বিশ্লেষকেরা মনে করেন।
তারা বলছেন, এই ঘটনায় সরকারের সিদ্ধান্ত নিতে গড়িমসি, সমন্বয়ের ঘাটতি, দক্ষতার অভাব স্পষ্ট হয়েছে। বড় কোনো দুর্ঘটনা সামাল দিতে জাতীয় সক্ষমতা, ব্যবস্থাপনা কতটা ভঙ্গুর, তা আরেকবার প্রকাশ পেয়েছে।
রাজনীতিকদের কেউ কেউ বলছেন, এই দুর্ঘটনায় সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা কমেছে।
সরকার আসলে ঘটনার গুরুত্ব যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছিল কি না, এমন প্রশ্নও উঠছে।
সরকারের ব্যর্থতার প্রশ্ন কেন আসছে?

বিধ্বস্ত বিমানের আগুনে পুড়ে শিশুদের হতাহতের ঘটনা নিয়ে অভিভাবকসহ সারাদেশের মানুষ যখন উদ্বেগ, উৎকণ্ঠার মধ্যে রয়েছেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছবি, ভিডিওসহ নানা তথ্য ছড়িয়ে পড়ছে–– তখনও হতাহতের পরিসংখ্যান তুলে ধরতে অনেক সময় নেওয়া হয়।
দুর্ঘটনার কয়েক ঘণ্টা পর সরকারের পক্ষ থেকে থেকে নিহত ও আহতদের পরিসংখ্যান দেওয়া হয়। ফলে মৃত্যুর সংখ্যা লুকানো হচ্ছে কি না––এমন সন্দেহ তৈরি হয় মানুষের মধ্যে।
উচ্চ মাধ্যমিক বা এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা ছিল ওই দুর্ঘটনার পরদিন। মাইলস্টোন স্কুলেও পরীক্ষার্থী রয়েছে। এই পরীক্ষা স্থগিত করার ক্ষেত্রেও সরকারের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা হয়েছে।
সোমবার দিবাগত রাত তিনটার দিকে পরীক্ষা স্থগিত করার ঘোষণা দেওয়া হয়। তাও সেই সিদ্ধান্তের কথা প্রথমে জানা যায় একজন উপদেষ্টার ফেসবুক পোস্ট থেকে।
পরীক্ষা হবে কি না, সেটা জানার জন্য পরীক্ষার্থীরা সারারাত সামাজিক মাধ্যমে চোখ রাখবেন-এমন চিন্তা করা হলে তা দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেয় না বলে বিশ্লেষকেরা মনে করেন।
সরকারের পক্ষ থেকে এভাবে সিদ্ধান্ত আসায় ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় অনেক পরীক্ষার্থী পরীক্ষা কেন্দ্রে যাওয়ার পর স্থগিত হওয়ার খবর জানতে পারে। এ নিয়ে শিক্ষা উপদেষ্টা ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন।
আহতদের চিকিৎসায় হাসপাতালে বিশৃঙ্খল পরিবেশ নিয়ন্ত্রণেও সরকারের বিরুদ্ধে ব্যর্থতার অভিযোগ ওঠে।
শতাধিক আহতকে ঢাকায় বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বেশি সংখ্যক আহত শিশুকে ভর্তি করা হয় জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটে।
সোমবার দুর্ঘটনার পর আগুনে পুড়ে গুরুতর আহত শিশুদের একের পর এক যখন সেই হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছিল, তখন সরকারের কয়েকজন উপদেষ্টা তাদের প্রটোকল, দলবলসহ সেখানে পরিদর্শনে গেছেন। সেটা উপকারের চেয়ে আহতদের চিকিৎসা দেওয়ার ক্ষেত্রে বিঘ্ন ঘটায়।

বিএনপি, জামায়াতসহ বিভিন্ন দলের শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক নেতা দলবেধে হাসপাতালে গেছেন। তাদের নেতা-কর্মীদের ভিড়ে বার্ন ইনস্টিটিউটের ভেতরে-বাইরে তৈরি হয়েছিল বিশৃঙ্খল পরিবেশ।
এর বাইরে ছিল সাংবাদিক, বেসরকারি স্বেচ্ছ্বাসেবক ও উৎসুক মানুষের ভিড়। এ ধরনের পরিস্থিতিতে হাসপাতালে ভিড় না করতে চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে বার বার আবেদন জানাতে হয়।
দুর্ঘটনার পর আহতদের চিকিৎসা যখন বড় ইস্যু বা প্রধান অগ্রাধিকার, সেক্ষেত্রে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কিন্তু প্রথমদিনে স্বাস্থ্য উপদেষ্টার দৃশ্যমান কোনো ভূমিকা দেখা যায়নি। এ নিয়েও চলছে সমালোচনা।
অন্যদিকে, প্রধান উপদেষ্টার ফেসবুক পেজ থেকে অর্থ সহযোগিতার আহ্বান জানিয়ে পোস্ট দেওয়া হয়। পরে সেই পোস্ট সরিয়ে নেওয়া হয় ব্যাপক সমালোচনার মুখে।
এ বিষয়গুলো খারাপ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে বলে মনে করেন অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। নাগরিক অধিকার নিয়ে সোচ্চার অধ্যাপক মুহাম্মদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, “সরকারের পদক্ষেপগুলো নেওয়ার ক্ষেত্রে শিশুতোষ, খামখেয়ালি আচরণ প্রকাশ পেয়েছে। তাদের সংবেদনশীল মনে হয়নি।”
সেকারণে সরকারের প্রতি হতাহতের তথ্য গোপন করার সন্দেহ দেখা দেয় ও ব্যর্থতার বিষয় আলোচনায় এসেছে বলে মনে করেন অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ।
যদিও সরকারের একাধিক উপদেষ্টা বিবিসিকে বলেন, সরকারের পদক্ষেপগুলো প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা রয়েছে। সেজন্য অনেক অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।
তবে বিশ্লেষকদের অনেকে বলছেন, পদক্ষেপ বা সিদ্ধান্তগুলো নেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারের দুর্বলতা, সমন্বয়হীনতা দৃশ্যমান হয়েছে। আর সরকারের কারণেই প্রশ্ন তোলার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
সূত্রঃ বিবিসি