অস্ট্রেলিয়ার সাবেক অধিনায়ক ও প্রথম পূর্ণকালীন কোচ, আরও নানা ভূমিকায় যিনি রাঙিয়েছেন ক্রিকেট, কিংবদন্তি সেই ক্রিকেট ব্যক্তিত্ব বব সিম্পসন আর নেই। ৮৯ বছর বয়সে শনিবার মারা গেছেন অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাসের সবচেয়ে প্রভাববিস্তারি ব্যক্তিদের একজন।
অস্ট্রেলিয়ার হয়ে ৬২ টেস্ট ও দুটি ওয়ানডে খেলেছেন সিম্পসন। স্রেফ খেলোয়াড়ী জীবন দিয়েই তিনি স্মরণীয় হয়ে থাকতে পারতেন। তবে খেলা ছাড়ার পরের অধ্যায়ে তিনি নিজেকে ছাপিয়ে যান আরও। কোচ ও নির্বাচক হিসেবে অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার নায়ক তিনি। ইতিহাসের পাতায় পাতায় তার গৌরবময় উপস্থিতি।
চোয়ালবদ্ধ প্রতিজ্ঞার ওপেনার ছিলেন তিনি, ক্রমে নিজের ব্যাটিং সমৃদ্ধ করেন নানা স্ট্রোকের মালায়। সিঙ্গল বের করতে তার জুড়ি ছিল না। ৪৬.৮১ গড়ে রান করেছেন ৪ হাজার ৮৬৯। লেগ স্পিনে উইকেট নিয়েছেন ৭১টি। স্লিপ ফিল্ডিংয়ে তাকে মনে করা হয় সর্বকালের সেরাদের একজন। ক্যাচ নিয়েছেন ১১০টি।
নিউ সাউথ ওয়েলসের হয়ে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে তার যাত্রা শুরু হয়েছিল স্রেফ ১৬ বছর বয়সে। খেলেছেন ৪২ বছর বয়স পর্যন্ত। ৬০ সেঞ্চুরিতে ২১ হাজারের বেশি রান করেছেন ৫৬.২২ গড়ে, উইকেট ৩৪৯টি। ক্যাচ নিয়েছেন ৩৮৩টি।
বিল লরির সঙ্গে তার উদ্বোধনী জুটি ছিল অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাসের সেরা। ৬২ ইনিংস একসঙ্গে ব্যাট করে ৬০.৯৪ গড়ে ৩ হাজার ৫৯৫ রান এসেছে এই জুটিতে। এখনও তা অস্ট্রেলিয়ার তৃতীয় সফলতম উদ্বোধনী জুটি।
১৯৬৫ সালে ব্রিজটাউনে দুজনের ৩৮২ রানের জুটি এখনও অস্ট্রেলিয়ার রেকর্ড। ওয়েস হল, চার্লি গ্রিফিথ, গ্যারি সোবার্স, ল্যান্স গিবসের সামনে দুজনই করেছিলেন ডাবল সেঞ্চুরি।
২১ বছর বয়সে তার টেস্ট অভিষেক ১৯৫৭ সালের দক্ষিণ আফ্রিকা সফর দিয়ে। অভিষেক ইনিংস ছয় নম্বরে খেলে করেন ৬০ রান। প্রথমবার ওপেন করেন সপ্তম টেস্টে। এই ভূমিকায় প্রথম ইনিংসে সেঞ্চুরির সুবাস পেয়ে আউট হন ৯২ রানে।
ব্যাটিং-বোলিং মিলিয়ে দলে জায়গা পাকা করে ফেললেও বিস্ময়করভাবে প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি পেতে তাকে অপেক্ষা করতে হয় ৩০ টেস্ট পর্যন্ত! এর আগেই তিনি অধিনায়কের দায়িত্ব পেয়ে যান।
দীর্ঘ অপেক্ষার আক্ষেপ ঘুচিয়ে দিতেই যেন প্রথম সেঞ্চুরিটিকে রূপ দেন তিনি ম্যারাথন এক ইনিংসে! ১৯৬৪ অ্যাশেজের ওল্ড ট্র্যাফোর্ড টেস্টে ৩১১ রানের ইনিংস উপহার দেন ৭৬২ মিনিট ক্রিজে কাটিয়ে ৭৪৩ বল খেলে। বল খেলার হিসেবে যা টেস্ট ইতিহাসের তৃতীয় দীর্ঘতম ইনিংস, মিনিটের দিক থেকে দ্বাদশ দীর্ঘতম।
৫২ টেস্ট খেলে ১৯৬৮ সালের জানুয়ারিতে অবসরে যান তিনি। ধারাভাষ্যকার ও প্রশাসক হিসেবে সম্পৃক্ত থাকেন ক্রিকেটে। কিন্তু অবসরের প্রায় ১০ বছর পর আবার মাঠে ফেরেন তিনি চমকপ্রদ এক অধ্যায়ের রচনা করে। ক্যারি প্যাকারের ওয়ার্ল্ড সিরিজ ক্রিকেট তখন বিশ্ব ক্রিকেটে তোলপাড় ফেলে দিয়েছে। শীর্ষ ক্রিকেটারদের বড় অংশই সেখানে নাম লিখিয়েছেন। ভারতের বিপক্ষে সিরিজের জন্য অস্ট্রেলিয়ার দল গড়াই তখন কঠিন!
দেশের ডাকে ৪২ ছুঁইছুঁই বয়সে আবার অধিনায়ক হিসেবে টেস্ট ক্রিকেটে ফেরেন সিম্পসন। সেই ফেরাকেও অবিশ্বাস্যভাবে স্মরণীয় করে রাখেন তিনি ব্যাটিংয়ে আর নেতৃত্বে। তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ সিরিজে শেষ ম্যাচটি জিতে অস্ট্রেলিয়া সিরিজ জিতে নেয় ৩-২ ব্যবধানে। আরও বিস্ময়কর ছিল সিম্পসনের পারফরম্যান্স। ১০ বছর পর ফিরে দুটি করে সেঞ্চুরি ও ফিফটিতে তিনি করেন সিরিজের সর্বোচ্চ ৫৩৯ রান!
পরে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরেও পাঁচ টেস্টে দলকে নেতৃত্ব দেন তিনি। ক্যারিবিয়ান পেস-দানবদের বিপক্ষে অবশ্য ওই বয়সে আর ভালো করতে পারেননি। ওই সিরিজ দিয়েই শেষ হয় প্রত্যাবর্তনের পর তার পথচলা।
তার ১০ টেস্ট সেঞ্চুরির সবকটিই অধিনায়ক হিসেবে। নেতৃত্বের ৩৯ টেস্টে তার ব্যাটিং গড় ৫৪.০৭, অধিনায়ক ছাড়া ২৩ টেস্টে ব্যাটিং গড় ৩৩.৬৭।
আশির দশকের মাঝামাঝি অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট আবার যখন চরম দুঃসময়, টানা দুই বছরে ধরা দেয়নি কোনো টেস্ট সিরিজ জয়, ডাক পড়ে সেই সিম্পসনের। এবার কোচ হিসেবে। এই ভূমিকাতেও তিনি অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটের গৌরব ফেরানোর পাশাপাশি উজ্জ্বল ভবিষ্যতের পথ রচনা করে দেন অধিনায়ক অ্যালান বোর্ডারের সঙ্গে মিলে।
খেলোয়াড়ি জীবনে যেমন তিনি ছিলেন সময়ের চেয়ে এগিয়ে, কোচ হিসেবে ছিলেন যেন আরও বেশি এগিয়ে। শৃঙ্খলা, পরিশ্রম, ফিটনেস ও ফিল্ডিংয়ে বাড়তি জোর, সৃষ্টিশীলতা, সবকিছু মিলিয়ে নতুন সংস্কৃতি গড়ে অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটকে আবার শ্রেষ্ঠত্বের আসনে পৌঁছে দেন তিনি।
তার হাত ধরে ক্রিকেট বিশ্বকে চমকে দিয়ে ১৯৮৭ বিশ্বকাপ জয় করে অস্ট্রেলিয়া। ১৯৮৯ সালে তার দল পুনরুদ্ধার করে অ্যাশেজ, যা তাদের কাছে রয়ে যায় ২০০৫ অ্যাশেজের আগ পর্যন্ত। প্রায় ২০ বছর পর ফ্র্যাঙ্ক ওরেল ট্রফি (অস্ট্রেলিয়া-ওয়েস্ট ইন্ডিজ লড়াই) জয়ও ধরা দেয় তার কোচিংয়ে। ১৯৯৫ সাল ওয়েস্ট ইন্ডিজে ওই সিরিজ জয় দিয়েই বিশ্বের এক নম্বর দলের অনানুষ্ঠানিক তকমা পেয়ে যায় অস্ট্রেলিয়া।
ডেভিড বুন, ডিন জোন্স, স্টিভ ওয়াহ, ক্রেইগ ম্যাকডারমট, মার্ভ হিউজের মতো ক্রিকেটাররা গ্রেটনেসের পথে এগিয়ে যান সিম্পসনের হাত ধরেই। কোচিংয়ের পাশাপাশি ১৯৮৭ সালে নির্বাচক প্যানেলেও অন্তর্ভুক্ত করা হয় তাকে। এখানেও তিনি বছরের পর বছর যথারীতি ছাপ রাখেন প্রবলভাবে। মার্ক টেইলর, মার্ক ওয়াহ, শেন ওয়ার্ন, ইয়ান হিলি, জাস্টিন ল্যাঙ্গার, ম্যাথু হেইডেন, গ্লেন ম্যাকগ্রা, ডেমিয়েন মার্টিন, রিকি পন্টিং ও এমন আরও অনেকেই অস্ট্রেলিয়া দলে জায়গা পান ও নিজেদের পোক্ত করেন সিম্পসনের তত্ত্বাবধানে।
তার কোচিংয়ে ১৯৯৬ বিশ্বকাপেও ফাইনালে খেলে অস্ট্রেলিয়া। এরপরই তিনি দায়িত্ব ছেড়ে দেন।
কিংবদন্তি শেন ওয়ার্নসহ আরও অনেকের চোখেই সিম্পসন ছিলেন সর্বকালের সেরা কোচ।
অস্ট্রেলিয়ার দায়িত্ব ছাড়ার পর কাউন্টি ক্রিকেটে লেস্টারশায়ার ও ল্যাঙ্কাশায়ারকে কিছুদিন কোচিং করান তিনি। ভারতের রাঞ্জি ট্রফিতে কোচিং পরামর্শক হিসেবে কাজ করেন। ১৯৯৯ বিশ্বকাপে ছিলেন ভারতীয় দলের পরামর্শক। তার কোচিংয়েই নেদারল্যান্ডস প্রথমবার বিশ্বকাপে জায়গা করে নেয় ২০০৭ আসরে।
১৯৬৫ সালে উইজডেনের বর্ষসেরা হন সিম্পসন। ১৯৭৮ সালে তাকে দেওয়া হয় ‘অর্ডার অব অস্ট্রেলিয়া’ খেতাব, ২০০৭ সালে যা উন্নীত করা হয় ‘অফিসার অব অস্ট্রেলিয়া’ খেতাবে। আইসিসি ও অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটের ‘হল অব ফেম’ গৌরবান্বিত হয়েছে তার আলোয়।
সব অর্জন আর কৃতিত্বকে সঙ্গী করে তিনি পাড়ি জমালেন অনন্তলোকে। তবে এটা তো কেবলই দেহাবসান। ক্রিকেটের আঙিনায় অমরত্ব ছুঁয়েছেন তো তিনি সেই কবেই!