টেকটোনিক প্লেটের তিনটি সক্রিয় ফল্টের ওপর অবস্থান করায় ভূমিকম্পের অত্যন্ত উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে বাংলাদেশ। ভারত, মিয়ানমার ও ইউরেশীয় এই তিন প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ায় দেশের ভৌগোলিক অবস্থান বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। সিলেটের ডাউকি ফল্ট, চট্টগ্রাম–টেকনাফের চিটাগং–আরাকান ফল্ট এবং মিয়ানমারের সাগাইং ফল্ট মিলিয়ে বিশেষজ্ঞরা বাংলাদেশকে ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলের শীর্ষ ঝুঁকির তালিকায় রেখেছেন।
শনিবার রাজধানীর হোটেল ওয়েস্টিনে অনুষ্ঠিত ‘আর্থকুয়েক অ্যাওয়ারনেস, সেফটি প্রটোকল অ্যান্ড ইমার্জেন্সি প্রিপারেডনেস’ সেমিনারে দেশি–বিদেশি ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞরা এসব ঝুঁকির কথা তুলে ধরেন। সেমিনারের আয়োজন করে জেসিএক্স ডেভেলপমেন্টস লিমিটেড।
বিশেষজ্ঞরা জানান, দ্রুত নগরায়ণ, ঘনবসতি, বিল্ডিং কোড উপেক্ষা, অপরিকল্পিত সড়কব্যবস্থা এবং দুর্বল ভবন কাঠামো বড় ধরনের ভূমিকম্প ঘটলে বিপর্যয়কে আরও ভয়াবহ করে তুলতে পারে। তাই সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া ভূমিকম্প–সহনশীল বাংলাদেশ গড়া সম্ভব নয়।
সেমিনারে অংশ নেন ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ, স্থপতি, প্রকৌশলী, রিয়েল এস্টেট উদ্যোক্তা, নীতিনির্ধারকসহ বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিরা। জাপানের ভূমিকম্প-সহনশীল স্থাপত্য বিশেষজ্ঞ কেসিরো সাকো ও হেসাইয়ে সুগিয়ামা জাপানের অভিজ্ঞতার আলোকে নিরাপদ স্থাপত্য নকশা, টেকসই নির্মাণমান এবং দুর্যোগ-পরবর্তী ব্যবস্থাপনা নিয়ে পরামর্শ দেন।
বক্তারা বলেন, বড় বিপর্যয় ঠেকাতে ভূমিকম্প প্রতিরোধী ভবন নির্মাণ, পুরোনো ভবনের স্ট্রাকচারাল অডিট, নির্মাণ কাজে কঠোর তদারকি, জরুরি উদ্ধার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং কার্যকর প্রাথমিক সতর্কবার্তা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি নাগরিক পর্যায়ে নিয়মিত মহড়া, সচেতনতা কার্যক্রম এবং পরিবারভিত্তিক জরুরি প্রস্তুতিও অপরিহার্য।
জেসিএক্স ডেভেলপমেন্টস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ইকবাল হোসেন চৌধুরী বলেন, সাম্প্রতিক ঢাকায় টানা কয়েক দফা ভূমিকম্প দেশের ঝুঁকির বিষয়টি আবারও সামনে এনেছে। ঘনবসতি ও দুর্বল ভবন কাঠামোর কারণে বড় ভূমিকম্প ঘটলে মৃত্যুর সংখ্যা ও ক্ষয়ক্ষতি ভয়াবহ হতে পারে।
সেমিনারে আরও বক্তব্য দেন খ্যাতিমান প্রকৌশলী প্রফেসর ড. এম শামীম জেড বসুনিয়া, প্রফেসর ড. সৈয়দ ফখরুল আমিন (বুয়েট), রিহ্যাব প্রেসিডেন্ট ওয়াহিদুজ্জামান, সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট লিয়াকত আলী, রাজউকের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ আশরাফুল ইসলাম, ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল্লাহ আল হোসেন চৌধুরী রিজভী, প্রফেসর ড. রাকিব আহসান (বুয়েট), বাজুস প্রেসিডেন্ট এনামুল হক খান, বিএমইডির পরিচালক মমিনুল ইসলাম, স্থপতি আরিফুল ইসলাম, স্থপতি রফিক আজম ও ভিস্তারার এমডি মুস্তফা খালিদ পলাশ।
সেমিনারে উল্লেখ করা হয়, গত ১০০ বছরে বাংলাদেশে ২০০টির বেশি ভূমিকম্প রেকর্ড হয়েছে। ২০২৪ সাল থেকে কম্পনের হার আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৬ সালে কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় সতর্ক করা হয়—গঙ্গা–ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় থাকা ‘মেগাথার্স্ট’ ফল্ট থেকে ৯ মাত্রার ভূমিকম্পের আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সিলেট–টেকনাফ সাবডাকশন জোনে ৮০০–১০০০ বছরের সঞ্চিত শক্তি এখনো মুক্ত হয়নি—যা সবচেয়ে উদ্বেগজনক সতর্কসংকেত।
বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলেন, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে একটি বিধ্বংসী ভূমিকম্প বাংলাদেশকে বড় বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিতে পারে।