দেশে খাদ্যপণ্যে ভয়াবহ মাত্রায় দূষণ ও ক্ষতিকর রাসায়নিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। ভারী ধাতু, কীটনাশক, তেজস্ক্রিয়তা এবং জৈবদূষণ এই চার ধরনের দূষকে দেশের খাদ্যব্যবস্থা চরম ঝুঁকির মুখে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) গবেষণা অনুযায়ী, প্রতি বছর বিশ্বে ৬০ কোটি এবং বাংলাদেশে প্রায় ৩ কোটি শিশু খাদ্যবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়। এ রোগে আক্রান্ত প্রতি তিন শিশুর একজনের মৃত্যু ঘটে।
এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতিতে গতকাল রবিবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকের সভাপতিত্ব করেন প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি খাদ্যদূষণের ভয়াবহতা তুলে ধরে জনস্বাস্থ্য রক্ষায় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর জোর দেন।
খাদ্যে সিসার উপস্থিতি ভয়াবহ মাত্রায়
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ) জানায়, এ বছর পরীক্ষা করা ৮১৪টি খাদ্য নমুনার মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশে অতিরিক্ত সিসা বা সিসা ক্রোমেট পাওয়া গেছে। ১৮০টি নমুনার মধ্যে ২২টিতে সিসা শনাক্ত হয়েছে। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, দেশে সাড়ে ৩ কোটি শিশু সিসার সংক্রমণে আক্রান্ত। গর্ভবতী নারীদের ৫ শতাংশের দেহেও সিসার উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
বিএফএসএ চেয়ারম্যান জানান, সিসা দেহে প্রবেশ করে মস্তিষ্ক, যকৃত্, কিডনি এবং হাড়ে জমা হয়। শিশুদের হাড় নরম থাকায় সিসা সহজেই মস্তিষ্কে গিয়ে মানসিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে।
অ্যান্টিবায়োটিক ও কীটনাশকের ভয়াবহ ব্যবহার
বৈঠকে কৃষি কর্মকর্তারা জানান, অনেক পোলট্রি ফার্মে অনিয়ন্ত্রিতভাবে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হচ্ছে। মুরগিতে অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগের অবশিষ্টাংশ ৭–২৮ দিন থাকে। কিন্তু ২৮ দিন অপেক্ষা না করে অনেকেই দ্রুত বাজারজাত করছে, ফলে মাংসের মাধ্যমে মানবদেহে অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক প্রবেশ করছে।
এক যৌথ গবেষণায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সংগৃহীত পানির ৮৭টি নমুনা এবং ২৩ ধরনের মাছ পরীক্ষা করে ৩০০ ধরনের ওষুধ, ২০০ ধরনের কীটনাশক ও ১৬ ধরনের পিএফএএস (চিরস্থায়ী রাসায়নিক) পাওয়া গেছে।
জরুরি নির্দেশ প্রধান উপদেষ্টার
বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা বলেন,
“খাদ্যে বিভিন্ন দূষণের অস্তিত্ব আমরা জানি। আমাদের সন্তান ও পরিবারের কথা ভেবেই এখনই কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।”
তিনি সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা ও মন্ত্রণালয়কে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে খাদ্যদূষণ মোকাবিলায় করণীয় সম্পর্কে লিখিত প্রস্তাবনা দাখিলের নির্দেশ দেন।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন কৃষি, খাদ্য, স্বাস্থ্য, প্রাণিসম্পদ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টারা, মন্ত্রণালয়গুলোর সচিব, বিএসটিআই, ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তর, বিএফএসএ, পরমাণু শক্তি কমিশনসহ বিভিন্ন সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তারা।
অবৈধ পোলট্রি ফার্ম ও কৃষিতে বিষাক্ত কীটনাশন নিয়ে উদ্বেগ
কর্মকর্তারা জানান, বড় প্রতিষ্ঠানে কিছুটা সতর্কতা থাকলেও অনেক চোরাগোপ্তা ফার্ম কর্তৃপক্ষের নজর এড়িয়ে বিপজ্জনকভাবে অ্যান্টিবায়োটিক ও কীটনাশক ব্যবহার করছে। মাছ, মাংস ও দুগ্ধজাত পণ্যেও এর প্রভাব পড়ছে। কৃষিতে অবৈধ কীটনাশক ব্যবহারের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা প্রয়োজন বলে মত দেন কর্মকর্তারা।
খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সচেতনতার ওপর জোর
খাদ্য উপদেষ্টা বলেন,
“খাদ্য নিশ্চিত করতে গিয়ে তার নিরাপত্তার বিষয়টি অনেক সময় উপেক্ষিত হয়। গণমাধ্যমকে এ বিষয়ে সচেতনতা তৈরিতে আরও ভূমিকা রাখতে হবে।”
তিনি পাঠ্যপুস্তকে খাদ্যনিরাপত্তা বিষয়ক অধ্যায় যুক্ত করারও প্রস্তাব দেন।
বৈঠকে প্রকাশিত তথ্য প্রমাণ করে, খাদ্যদূষণ এখন দেশের জন্য বড় জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হয়েছে। শিশু ও পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়ছে সিসা, কীটনাশক, অ্যান্টিবায়োটিক ও রাসায়নিক দূষণে। সরকারের জরুরি উদ্যোগই পারে এই সংকট মোকাবিলার পথ সুগম করতে।