কয়েক দিন পরই নতুন বছরকে বরণ করে নেবে সবাই। বিদায় নিতে যাওয়া ২০২৪ সালে বাংলাদেশের ফুটবলে প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি মিলিয়ে আছে অনেক কিছুই। অক্টোবরে নেপালে নারী সাফে টানা দ্বিতীয়বারের মতো শিরোপা জয়ের সঙ্গে ছেলেদের জাতীয় দলের ব্যর্থতা।
বাফুফেতে নতুন নেতার আবির্ভাবের পর বছরের শেষ দিকে এসে হামজা চৌধুরীর বাংলাদেশি হওয়াটা অনেক বড় সুখবর দেশের ফুটবলের জন্য। ২০২৪ সালে কেমন ছিল দেশের ফুটবলের পারফরম্যান্স, সমকাল পাঠকদের জন্য সেটা তুলে ধরা হলো। লিখেছেন সাখাওয়াত হোসেন জয়
টানা দ্বিতীয় সাফ
ম্যাচ খেলার ঘাটতি, বেতন বকেয়া– সবকিছু মিলিয়ে বাংলাদেশ নারী জাতীয় দলের অবস্থা ছিল যাচ্ছেতাই। নেপাল সাফে সাবিনা খাতুনদের ঘিরে প্রত্যাশাও ছিল না। গ্রুপ পর্বে পাকিস্তানের সঙ্গে হারতে হারতে ড্র করা মেয়েদের টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় দেখছিলেন সবাই। এর মধ্যে হিমালয়ের দেশে সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্বটা প্রকট আকার ধারণ করে। মাঠ এবং মাঠের বাইরের নানা ইস্যুতে এলোমেলো সেই দলকে এক সুতোয় নিয়ে আসেন ব্রিটিশ কোচ পিটার বাটলার। গ্রুপ ‘এ’র শেষ ম্যাচে ভারতকে ৩-১ গোলে উড়িয়ে দুর্দান্তভাবে ঘুরে দাঁড়ায় বাংলাদেশের মেয়েরা। সেমিফাইনালে ভুটানের জালে সাতবার বল পাঠানো বাংলাদেশ শিরোপা মঞ্চে পায় আগেরবারের ফাইনালিস্ট স্বাগতিক নেপালকে।
কাঠমান্ডুর দশরথ স্টেডিয়ামে ৩০ অক্টোবর অনুষ্ঠিত ফাইনালে নেপালকে ২-১ গোলে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো সাফের শিরোপা জেতে সাবিনা-তহুরারা। দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে ঋতুপর্ণা চাকমা টুর্নামেন্ট সেরা ফুটবলার এবং রুপনা চাকমা জেতেন সেরা গোলরক্ষকের পুরস্কার। নারী ফুটবলে ইতিহাস গড়া দলকে পরদিনই হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ছাদখোলা বাসে বাফুফেতে নিয়ে যাওয়া যায়।
সংবর্ধনার সঙ্গে নানা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান পুরস্কার দিয়েছেন মেয়েদের। বাংলাদেশের ফুটবলে জাতীয় দলে এই প্রথম মেয়েরা কোনো আসরে পরপর দু’বার শিরোপা জিতেছে।
জাতীয় দলের ব্যর্থতা
২০২৩ সালে ব্যাঙ্গালুরু সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে অসাধারণ পারফরম্যান্স দেখিয়ে সেমিফাইনালে খেলা বাংলাদেশ জাতীয় দলের জন্য এই বছরটি হতাশার। প্রাপ্তি বলতে আট ম্যাচে মাত্র দুটিতে জয়। সেটাও ভুটান এবং মালদ্বীপের বিপক্ষে। ২০২৬ বিশ্বকাপ বাছাইয়ে কিছুটা লড়াই করেছিল ফিলিস্তিনের বিপক্ষে। ২৬ মার্চ কিংস অ্যারেনায় হেরেছিল এক গোলে। বাকি ম্যাচগুলোতে খুব একটা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেনি হ্যাভিয়ের ক্যাবরেরার দল।
কুয়েতে ফিলিস্তিনের কাছে ৫-০ গোলে হারের লজ্জাও আছে শেখ মোরসালিন-রাকিব হোসেনদের। সবচেয়ে বড় ধাক্কা ভুটানের কাছে পরাজয়টি। র্যাঙ্কিং বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে সেপ্টেম্বরে ভুটানে গিয়ে দুই ম্যাচ সিরিজের একটিতে হার এবং আরেকটিতে ড্র করেছিল তারা। ঘরের মাঠে ফিফা প্রীতি ম্যাচে মালদ্বীপের বিপক্ষেও অম্লমধুর অভিজ্ঞতা হয়েছিল তপু বর্মণ-মিতুল মারমাদের। স্বস্তি অবশ্য বছরের শেষ ম্যাচে দ্বীপ দেশটির বিপক্ষে জয়। তাতেও ব্যর্থতা আড়াল করতে পারবেন না ফুটবলাররা।
বাফুফেতে বাঁকবদল
সবকিছু ঠিকই চলছিল। টানা পঞ্চমবারের মতো বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি হওয়ার লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন কাজী সালাউদ্দিন। গত ৫ আগস্ট পট পরিবর্তনের পরও নিজের নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত অনড় ছিলেন তিনি। কিন্তু চারদিক থেকে সমালোচনা আর নানা চাপে শেষ পর্যন্ত নির্বাচন না করার ঘোষণা দেন সালাউদ্দিন। তাতে বাফুফেতে তাঁর ১৬ বছরের অধ্যায়ের ইতি ঘটে। শুধু সালাউদ্দিই নন, তাঁর দীর্ঘদিনের সঙ্গী সিনিয়র সহসভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদীও সরে দাঁড়ান।
কাজী নাবিল আহমেদও আর সামনে আসনেনি। তাতে ফেডারেশনে নতুন মুখের সম্ভাবনা জাগে। বলতে গেলে, বিনা বাধায় ২৬ অক্টোবর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সভাপতি হন তাবিথ আউয়াল। নির্বাচন ছাড়াই সিনিয়র সহসভাপতি হয়েছেন মো. ইমরুল হাসান। চার সহসভাপতির সবাই নতুন মুখ। এর মধ্যে আলোচনায় ছিলেন যশোর শামসুল হুদা একাডেমির নাসের শাহরিয়ার জাহেদি।
হামজার বাংলাদেশি হওয়া
বেশ কয়েক বছর ধরেই বাংলাদেশের ফুটবলে আলোচনা ছিলেন হামজা দেওয়ান চৌধুরী। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ক্লাব লিস্টার সিটিতে খেলেন বলেই ইংল্যান্ড প্রবাসী এ তারকাকে ঘিরে আগ্রহ ছিল সবার। নানা ধাপ পেরিয়ে ১৯ ডিসেম্বর বাফুফে জানিয়ে দেয়, হামজা চৌধুরীকে বাংলাদেশের হয়ে খেলার অনুমতি দিয়েছে ফিফা প্লেয়ার স্ট্যাটাস কমিটি।
এর পর থেকেই এ ডিফেন্ডারকে নিয়ে নানা হিসাবনিকাশ শুরু হয়েছে। ডেনমার্কপ্রবাসী জামাল ভূঁইয়া এবং ফিনল্যান্ডপ্রবাসী তারিক কাজি লাল-সবুজ জার্সিতে অভিষেক হলেও হামজার মানের কোনো ফুটবলারকে দেখা যায়নি। সবকিছু ঠিক থাকলে ২০২৫ সালের মার্চে ভারতের বিপক্ষে এশিয়ান কাপ বাছাইয়ের ম্যাচ দিয়ে বাংলাদেশের জার্সিতে অভিষেক হতে পারে হামজা চৌধুরীর।
বয়সভিত্তিকে সাফল্য
মেয়েদের জাতীয় দলের সঙ্গে এই বছর বয়সভিত্তিক প্রতিযোগিতায় তিনটি শিরোপা জিতেছে বাং লাদেশ। মেয়েদের অনূর্ধ্ব-১৬ এবং ১৯ এবং ছেলেদের অনূর্ধ্ব-২০ সাফে ট্রফি জিতেছিল লাল-সবুজের দলটি।
কিংসের ইতিহাস
প্রিমিয়ার লিগে টানা পঞ্চম শিরোপা জিতে নতুন ইতিহাস গড়ে বসুন্ধরা কিংস। লিগের বাইরে ফেডারেশন এবং স্বাধীনতা কাপের ট্রফি জিতে দলটি গত মৌসুমে ট্রেবল জয়ের কীর্তি গড়েছে। আর এই বছরই নতুন মৌসুমের প্রথম টুর্নামেন্ট চ্যালেঞ্জ কাপের ট্রফি ঘরে তুলেছে কিংস। তবে ৫ আগস্ট পরিবর্তিত পরিস্থিতির প্রভাব পড়ে দেশের ক্লাব ফুটবলে।
শেখ রাসেল ক্রীড়া চক্র এবং শেখ জামাল ধানমন্ডি ক্লাব নতুন মৌসুমে দল গড়েনি। কোনো ট্রফি না জিতলেও বসুন্ধরা কিংসের সঙ্গে সমানতালে পাল্লা দিয়েছিল মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব।
হারিয়েছে
২০২৪ সালে বাংলাদেশের ফুটবল হারিয়েছে এক কিংবদন্তিকে। গত ১৮ নভেম্বর না ফেরার দেশে চলে যান স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের অধিনায়ক জাকারিয়া পিন্টু। এর আগে বিদায় নিয়েছিলেন সাইদুর রহমান প্যাটেল, বিমল কর এবং আমিনুল ইসলাম সরুজ। তারাও স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের সদস্য ছিলেন।