বাংলাদেশের ফুটবলে দর্শকদের এমন উন্মাদনা অনেক দিন দেখা যায়নি। ২০২৫ সালের ১০ জুন ঢাকার জাতীয় স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত একটি আন্তর্জাতিক ম্যাচের টিকিটের জন্য সমর্থকদের পাশাপাশি সাবেক ফুটবলার, ক্লাব কর্মকর্তা ও রেফারিরাও হন্যে হয়ে খুঁজেছেন। সেই উন্মাদনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন একজন— হামজা দেওয়ান চৌধুরী।
ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে খেলা এই সিলেটি বংশোদ্ভূত মিডফিল্ডার ২০২৫ সালের ২৫ মার্চ বাংলাদেশের জার্সিতে আন্তর্জাতিক অভিষেক করেন। তবে দেশের মাটিতে তার প্রথম ম্যাচকে ঘিরে সৃষ্টি হয় ব্যতিক্রমী উচ্ছ্বাস। মাঠে নেমে নিজের পারফরম্যান্স দিয়েও তিনি সেই প্রত্যাশার প্রতিদান দেন।
এ পর্যন্ত বাংলাদেশের হয়ে নয়টি ম্যাচে খেলেছেন হামজা। ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হয়েও করেছেন চারটি গোল, সঙ্গে রয়েছে একটি অ্যাসিস্ট। তবে সংখ্যার চেয়েও বেশি আলোচিত হয়েছে তার নেতৃত্ব, ম্যাচ নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা এবং মাঠজুড়ে প্রভাব বিস্তার।
বাংলাদেশের হয়ে খেলতে দীর্ঘদিনের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে হামজাকে। নাগরিকত্ব, সংশ্লিষ্ট ফুটবল সংস্থার ছাড়পত্র এবং ফিফার অনুমোদন পাওয়ার পর ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের হয়ে খেলার অনুমতি পান তিনি।
২০২৫ সালের মার্চে সিলেট আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তার আগমন ঘিরে নজিরবিহীন উচ্ছ্বাস দেখা যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিমান ট্র্যাকিং থেকে শুরু করে বিমানবন্দরে হাজারো মানুষের উপস্থিতি—সবকিছুই প্রমাণ করে, বাংলাদেশের ফুটবল নতুন এক তারকার অপেক্ষায় ছিল।
শিলংয়ে ভারতের বিপক্ষে এশিয়ান কাপ বাছাইপর্বের ম্যাচে অভিষেকেই নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দেন হামজা। ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হলেও ম্যাচজুড়ে তাকে দেখা যায় রক্ষণ, মাঝমাঠ ও আক্রমণের সংযোগ তৈরি করতে। ভারতের অভিজ্ঞ ফরোয়ার্ড সুনীল ছেত্রীকে কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে প্রশংসা কুড়ান তিনি।
ঢাকায় ভুটানের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে বাংলাদেশের হয়ে নিজের প্রথম গোল করেন হামজা। পরে সিঙ্গাপুরের বিপক্ষেও তার পারফরম্যান্স নজর কাড়ে। এমনকি ম্যাচ শেষে সিঙ্গাপুরের কোচও স্বীকার করেন, হামজার উপস্থিতির কারণেই জয় পেতে তাদের কঠিন লড়াই করতে হয়েছে।
হংকংয়ের বিপক্ষে এক ম্যাচে ফ্রি-কিক থেকে দুর্দান্ত গোল করেন তিনি। পরে নেপালের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে করেন জোড়া গোল—একটি ছিল দর্শনীয় বাইসাইকেল কিক, অন্যটি পানেনকা পেনাল্টি। একই বছরের নভেম্বরে ভারতের বিপক্ষে ঐতিহাসিক জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন হামজা।
সর্বশেষ প্রীতি ম্যাচে সান মারিনোকে ২-১ গোলে হারিয়ে ইতিহাস গড়ে বাংলাদেশ। ইউরোপের কোনো দেশের বিপক্ষে এটিই বাংলাদেশের প্রথম জয়।
১৯৯৭ সালের ১ অক্টোবর ইংল্যান্ডের লেস্টারে জন্ম নেওয়া হামজার মা রাফিয়া চৌধুরী বাংলাদেশি। তার পারিবারিক শিকড় হবিগঞ্জের বাহুবলে। ছোটবেলা থেকেই ফুটবলের প্রতি আগ্রহী হামজা সাত-আট বছর বয়সে লেস্টার সিটির একাডেমিতে যোগ দেন।
পেশাদার ক্যারিয়ারের শুরু বার্টন অ্যালবিয়নের হয়ে হলেও ২০১৭ সালে লেস্টার সিটিতে ফিরে আসেন। একই বছর লিগ কাপে লিভারপুলের বিপক্ষে মূল দলে অভিষেক হয় তার। পরে প্রিমিয়ার লিগ, এফএ কাপ ও লিগ কাপে নিয়মিত খেলেন এবং ২০২১ সালে লেস্টারের হয়ে এফএ কাপ জয়ের স্বাদ পান। এক মৌসুম শেফিল্ড ইউনাইটেডে কাটিয়ে আবারও লেস্টারে ফেরেন তিনি।
একসময় ইংল্যান্ড জাতীয় দলে খেলার স্বপ্ন দেখলেও শেষ পর্যন্ত সেই সুযোগ হয়নি। ইংল্যান্ড অনূর্ধ্ব-২১ দলের হয়ে খেলার অভিজ্ঞতা থাকলেও পরবর্তীতে বাংলাদেশের হয়ে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার গড়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
হামজার ভাষায়, বাংলাদেশের হয়ে খেলার সিদ্ধান্ত ছিল তার জীবনের অন্যতম সেরা সিদ্ধান্ত।
মাঠের বাইরেও হামজা দ্রুত সতীর্থদের আস্থা অর্জন করেছেন। শেখ মোরসালিন, রাকিব হোসেনদের মতো ফুটবলাররা প্রকাশ্যেই বলেছেন, তার উপস্থিতি দলের সবাইকে আরও মনোযোগী ও আত্মবিশ্বাসী করেছে।
তার পথ অনুসরণ করে প্রবাসী বংশোদ্ভূত আরও কয়েকজন ফুটবলার—শামিত সোম, ফাহমিদুল ইসলাম, জায়ান আহমেদ ও কিউবা মিচেলের মতো তরুণরা বাংলাদেশের জার্সিতে খেলতে আগ্রহী হয়েছেন।
একই সঙ্গে হামজা বাংলাদেশের ফুটবলের অন্যতম ব্র্যান্ড আইকনে পরিণত হয়েছেন। তার আগমনের পর দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ফুটবলে বিনিয়োগ ও পৃষ্ঠপোষকতায় আগ্রহ দেখাতে শুরু করেছে।
হামজা চৌধুরী হয়তো একাই বাংলাদেশের ফুটবল বদলে দেবেন না। তবে তার আগমন প্রমাণ করেছে, বিশ্বমানের ফুটবল থেকে উঠে আসা খেলোয়াড়দের মাধ্যমে বাংলাদেশের ফুটবলও নতুন উচ্চতায় পৌঁছানোর সম্ভাবনা রাখে। লেস্টারের মাঠ থেকে লাল-সবুজের জার্সিতে তার এই যাত্রা বাংলাদেশের ফুটবলের নতুন অধ্যায়ের প্রতীক হয়ে উঠেছে।