নোয়াখালীর সোনাইমুড়িতে নিখোঁজের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক ভয়াবহ জোড়া হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করেছে সিআইডি। সম্পত্তি দখলের উদ্দেশ্যে সৎ মা কমলা খাতুন ও তার শিশু ছেলে নোমানকে হত্যা করে লাশ গুম করা হয়েছিল বলে জানিয়েছে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। ঘটনার প্রায় দুই বছর পর সিআইডির দীর্ঘ তদন্তে বেরিয়ে এসেছে শিউরে ওঠার মতো তথ্য।
সিআইডি সূত্রে জানা যায়, ২০১২ সালে বিধবা কমলা খাতুন দ্বিতীয়বার বিয়ে করেন বিপত্নীক আবুল কালাম আজাদকে। দু’জনেরই এটি ছিল দ্বিতীয় বিয়ে। তাদের সংসারে জন্ম নেয় ছেলে নোমান। অন্যদিকে আবুল কালাম আজাদের প্রথম সংসারের পাঁচ সন্তানের মধ্যে তিনজন জীবিত ছিলেন।
প্রায় সাত-আট বছর আগে আবুল কালাম আজাদের মৃত্যুর পর কমলা খাতুন তার সন্তান ও সৎ সন্তানদের নিয়ে একই বাড়িতে বসবাস করছিলেন। তবে পরে সম্পত্তিকে কেন্দ্র করে বিরোধ শুরু হয়। তদন্তে জানা যায়, মৃত্যুর আগে আবুল কালাম আজাদ প্রায় ৩০ শতাংশ জমি ও বসতবাড়ি দ্বিতীয় স্ত্রী কমলা খাতুন ও ছেলে নোমানের নামে লিখে দেন। যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় এক কোটি টাকা।
২০২৪ সালের ১০ মার্চ সৎ ছেলে জিয়াউর রহমান সাগর সোনাইমুড়ি থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। সেখানে উল্লেখ করা হয়, ৯ মার্চ থেকে কমলা খাতুন নিখোঁজ। পরে কমলা খাতুনের ছোট বোন রহিমা বেগম বিষয়টি সন্দেহজনক মনে করে আদালতে পিটিশন মামলা দায়ের করেন।
আদালতের নির্দেশে প্রথমে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) এবং পরে সিআইডি তদন্ত শুরু করে। দীর্ঘ অনুসন্ধানে উঠে আসে, সম্পত্তির ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে সৎ সন্তানদের সঙ্গে কমলা খাতুনের বিরোধ চলছিল।
তদন্তে আরও জানা যায়, ঘটনার আগে কমলা খাতুন ও তার শিশু ছেলে নোমানকে মারধর ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছিল। সিআইডি পরে কমলা খাতুনের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন উদ্ধার করে। মোবাইলটি ঢাকার সবুজবাগ এলাকার একটি বাসা থেকে ভাঙারি মালামালের সঙ্গে বিক্রি করা হয়েছিল বলে জানা যায়। অনুসন্ধানে ওই বাসার সঙ্গে অভিযুক্ত সাইফুল ইসলাম রাজন রাজুর সম্পৃক্ততার তথ্য মেলে।
দীর্ঘ তদন্ত ও প্রযুক্তির সহায়তায় ২১ মে ময়মনসিংহ থেকে সাইফুল ইসলাম রাজন রাজুকে গ্রেফতার করে সিআইডি। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে জিয়াউর রহমান সাগর ও আশিকুর রহমান টিপুকে গ্রেফতার করা হয়।
রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে অভিযুক্তরা জানান, সম্পত্তি দখলের উদ্দেশ্যে আগেই হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। বাড়ির পাশের পুকুরপাড়ে আগে থেকেই গর্ত খুঁড়ে রাখা হয়।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১ মার্চ রাতে কমলা খাতুন ও শিশু নোমানের খাবারের পানিতে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে দেওয়া হয়। তারা অচেতন হয়ে পড়লে গলায় গামছা পেঁচিয়ে, হাত দিয়ে গলা চেপে এবং বালিশ চাপা দিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। পরে লাশ গোপনে মাটিচাপা দেওয়া হয়। আলামত নষ্ট করতে ব্যবহৃত কাপড় ও গামছা আগুনে পুড়িয়ে ফেলা হয়।
অভিযুক্তদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২৪ মে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও এলাকাবাসীর উপস্থিতিতে পুকুর সেচ দিয়ে খনন করে কমলা খাতুন ও শিশু নোমানের দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়। পরে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ নোয়াখালী সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়।
সিআইডি জানিয়েছে, গ্রেফতার তিন অভিযুক্ত আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। দেহাবশেষ থেকে সংগৃহীত নমুনা ডিএনএ পরীক্ষার জন্য পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। এছাড়া এ ঘটনায় জড়িত অন্যদের শনাক্ত ও গ্রেফতারে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।