সোনারগাঁ (নারায়ণগঞ্জ) প্রতিনিধি :
নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিষ্ট্রিবিউশন কোম্পানির এক কর্মকর্তার যোগসাজসে প্রতি মাসে প্রায় কোটি টাকা রাজস্ব বঞ্চিত হচ্ছে সরকার। তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিষ্ট্রিবিউশন কোম্পানি মেঘনা ঘাট শাখার ম্যানেজার প্রকৌশলী সুরজিত কুমার সাহার বিরুদ্ধে অবৈধ চুনা ও ঢালাই কারখানার মালিকদের সঙ্গে যোগসাজস করে এ লুটপাটের অভিযোগ উঠে। ফলে তিতাস কর্তৃপক্ষের অভিযানেও বন্ধ করা যাচ্ছে না অবৈধভাবে গড়ে ওঠা চুনা ও ঢালাই কারখানা। উপজেলার বিভিন্ন স্থানে প্রায় অর্ধ শতাধিক চুনা ও ঢালাই কারখানা গড়ে তোলে বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা। সরকারি গ্যাস লাইন থেকে অবৈধভাবে সংযোগ সংযোগ নিয়ে এসব কারখানা চালানো হলেও সেই গ্যাসের বিনিময়ে প্রতি মাসে কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে সুরজিত সাহার নেতৃত্বে একটি চক্র। তবে এ চক্রের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে কাজ করছেন বিএনপির কিছু অসাধু নেতা-কর্মী। তাদের কাছ থেকে প্রতি মাসে মাসোহারা পেয়ে থাকেন এ সুরজিত সাহা। তার অফিসের কর্মচারীদের মাধ্যমে এ টাকা আদায় করা হয় বলে জানিয়েছেন চুনা কারখানার লোকজন। প্রকৌশলী সুরজিত কুমার সাহা মেঘনা অঞ্চলে ম্যানেজার হিসেবে যোগদান করার পর থেকে ব্যাঙের ছাতার মতো অবৈধ চুনা ও ঢালাই কারখানা গড়ে উঠছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। কোনভাবেই এসব কারখানা গড়ে তোলার প্রতিরোধ করা যাচ্ছে না। একের পর এক অভিযান পরিচালনা করলেও কোনভাবেই বন্ধ হচ্ছে না। ফলে ভাঙা গড়ার খেলায় মেতেছে তিতাস ও চুনা ও ঢালাই কারখানার মালিকরা। অভিযানে ভাঙার দু’একদিন পরই গড়ে তোলা হচ্ছে এসব অবৈধ চুনা করাখানা। এসব কারখানায় অবৈধ গ্যাস ব্যবহারের ফলে শিল্প কারখানায় গ্যাসের চাপ কমে যাচ্ছে। ফলে উৎপাদন ঘাটতি দেখা দিতে পারে বলে শিল্প মালিকরা জানিয়েছেন।
তিতাস সূত্রে জানা যায়, উপজেলার এসব কারখানায় প্রতি মাসে প্রায় ৩ লাখ ৩৩ হাজার ৩শ’ ঘনফুট গ্যাস অবৈধভাবে ব্যবহার করছে। বর্তমান বাজারমূল্যে যার আর্থিক ক্ষতি মাসে প্রায় এক কোটি টাকা ওপরে। গ্যাস ব্যবহারের ফলে এ বিপুল পরিমাণ টাকার রাজস্ব বঞ্চিত হচ্ছে সরকার।
অভিযোগ উঠেছে, গত ২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর উপজেলার পিরোজপুর, মোগরাপাড়া ও পৌর এলাকায় এসব অবৈধ চুনা ও ঢালাই কারখানার সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। প্রশাসনকে অনেকটা বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে দাপটের সঙ্গে এসব অবৈধ কারখানা চালিয়ে যাচ্ছে চক্রটি। এসব চুনা ও ঢালাই কারখানায় অধিক মুনাফার কারণে রাতারাতি এ ব্যবসায় ঝুঁকছে স্থানীয় বিএনপি নেতা-কর্মীরা। তিতাস কর্তৃপক্ষ কিছুদিন পরপর দায়সারা অভিযান পরিচালনা করলেও অভিযানের দু’একদিন সময় পাড় না হতেই পুনরায় চালু করা হচ্ছে এসব কারখানা।
স্থানীয়রা জানায়, উপজেলা ও পৌর বিএনপির বেশ কয়েকজন নেতা-কর্মী সরাসরি এ অবৈধ ব্যবসায়ের সঙ্গে জড়িত। তারা চুনা ও ঢালাই কারখানা পরিচালনার জন্য সরকারি গ্যাস লাইন থেকে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে গ্যাস সংযোগ নিয়ে এসব চুনা ও ঢালাই কারখানাগুলো চালাচ্ছেন। উপজেলার পৌর এলাকার দৈলেরবাগ এলাকায় পৌর বিএনপির সভাপতি মো.শাহজাহান মিয়া একটি অবৈধ চুনা কারখানা পরিচালনা করছেন। বাগমুছা এলাকায় পৌর বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক সাদিকুর রহমান সেন্টু, দিঘিরপাড় এলাকায় পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর জাহেদা আক্তার মনি’র জামাতা আবু বকর প্রান্ত, টিপুরদী এলাকায় নারায়ণগঞ্জ জেলা যুবদলের সাবেক যুগ্ম আহবায়ক হারুন অর রশিদ মিঠু, পিরোজপুর ইউনিয়নের ছয়হিস্যা এলাকায় সাংসদের ভাগিনা হারুন অর রশিদ, আবুল কাশেম মাস্টার, পিরোজপুর এলাকায় ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি শফিউল আলম বাচ্চু ও তার ভাই নেয়ামত উল্লাহ। পিরোজপুর বাসষ্টান্ড সংলগ্ন মুজ্জাফর আলী ফাউন্ডেশনের পাশে সিদ্ধিরগঞ্জের বিএনপি নেতা আতাউর রহমান ও জাহাঙ্গীর আলম এবং স্থানীয় বিএনপি কর্মী সোয়েব মোল্লা, মতিউর রহমান, নোয়াব প্রধান অবৈধ গ্যাস সংযোগ নিয়ে চুনা ও ঢালাই কারখানা গড়ে তোলছেন। এছাড়া পৌরসভার দুলালপুর, লাহাপাড়া ও দীঘিরপাড়, ঝাউচর, আষাঢ়িয়ারচর, ইসলামপুর এলাকায় একাধিক চুনা কারখানা গড়ে তোলা হয়েছে। উপজেলার মোগরাপাড়া ইউনিয়নের সোনাখালী, দমদমা, বন্দেরা ও ইউছুফগঞ্জ এলাকায়ও এ ধরনের কারখানা গড়ে তোলা হয়েছে। প্রতিটি কারখানায় তিতাস কর্তৃপক্ষ একাধিকবার অভিযান চালিয়ে ভেঙে দিলেও দু’একদিন পর তিতাস কর্মকর্তা সুরজিত সাহার সঙ্গে আতাঁত করে পুনরায় গড়ে তুলছেন। সম্প্রতি দিঘিরপাড় এলাকায় পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর জাহেদা আক্তার মনি’র জামাতা আবু বকর প্রান্তের কারখানায় অভিযান চালিয়ে তাকে ১০ দিনের কারাদন্ড ও ৫ হাজার টাকা অর্থদন্ড দেয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে চুনা শ্রমিকরা জানায়, চুনার ও ঢালাই কারখানার ব্যবসাটি খুবই লাভজনক। ফলে পুঁজি ছাড়া এ ব্যবসায়ে রাজনৈতিক নেতারা ঝুঁকছেন। প্রতি সপ্তাহে একবার চুনা নামানো হয়। মাঝামাঝি সময়ে অভিযান পরিচালনা করা হয়। ফলে তাদের তেমন কোনো ক্ষতি হয় না। তা ছাড়া অভিযানের আগে তারা জানতে পেরে পূর্ব প্রস্তুতি নিয়ে থাকেন। তিতাসের লোকজন তাদের কাছ থেকে মাসোহারা নেন বলে জানিয়েছেন।
নারায়ণগঞ্জ জেলার ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপসহকারী পরিচালক মো. আব্দুল্লাহ আল আরেফীন বলেন, আবাসিক এলাকায় এ ধরনের কারখানা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানকে ফায়ার সনদ দেওয়া হয় না।
তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের সোনারগাঁও অঞ্চলের ডিজিএম মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন জানান, আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করে কারখানাগুলো ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়াসহ মামলা করেও রোধ করতে পারছি না।
অভিযুক্ত তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিষ্ট্রিবিউশন কোম্পানি মেঘনা ঘাট শাখার ম্যানেজার প্রকৌশলী সুরজিত কুমার সাহার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, চুনা ও ঢালাই কারখানার মালিকদের সঙ্গে যোগসাজসের বিষয়টি সত্য না। টাকা নেওয়ার প্রশ্নই উঠে না। চুনা কারখানা বন্ধে এখন আমরা অভিযান করে জমির মালিকের বিরুদ্ধে থানায় নিয়মিত মামলা দায়ের করেছি।
তিনি আরো বলেন, তিতাসের মেঘনা অঞ্চলে গজারিয়া উপজেলা পড়েছে। সেখানে অভিযান করে এসব কারখানা বন্ধ করা হয়েছে। আশা করি দ্রুত সময়ের মধ্যে সোনারগাঁয়েও বন্ধ করা সম্ভব হবে। তবে মানুষ অনেক কথা বলবে, সত্য মিথ্যা উদঘাটন দরকার।