২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট মন্ত্রিসভার বিশেষ বৈঠকে অনুমোদন পেয়েছে। বৃহস্পতিবার (১১ জুন) সকালে জাতীয় সংসদ ভবনের মন্ত্রিসভা কক্ষে তারেক রহমান-এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বাজেট অনুমোদন দেওয়া হয়।
বৈঠকে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীসহ মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুযায়ী মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর মো. সাহাবুদ্দিন বাজেট প্রস্তাবে সম্মতি প্রদান করবেন। পরে বিকেল ৩টায় জাতীয় সংসদে বাজেট উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী।
এটি স্বাধীন বাংলাদেশের ৫৫তম জাতীয় বাজেট এবং বর্তমান সরকারের আমলে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর প্রথম বাজেট। আগামী ১ জুলাই থেকে নতুন অর্থবছর কার্যকর হবে।
৯.৩৮ লাখ কোটি টাকার বাজেট, ঘাটতি ২.৪৩ লাখ কোটি
অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের মোট বাজেটের আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ঋণের সুদ পরিশোধেই ব্যয় হবে ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
বাজেটে মোট রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। ফলে সামগ্রিক বাজেট ঘাটতি দাঁড়াবে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা।
এই ঘাটতি পূরণে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা এবং বিদেশি ঋণ ও সহায়তা থেকে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে।
রাজস্ব আদায়ে বড় দায়িত্ব এনবিআরের
বাজেটের মোট আয়ের প্রায় ৬৪ শতাংশ জোগান দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)-এর জন্য। সংস্থাটির রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা।
তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এই রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
পরিচালন ব্যয়ে ৬৭ শতাংশ
বাজেট বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় বাবদ মোট বাজেটের প্রায় ৬৭ শতাংশ ব্যয় হবে।
অন্যদিকে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি)-র জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ৩২ শতাংশের কিছু বেশি।
শিক্ষায় রেকর্ড বরাদ্দ
নতুন বাজেটে মানবসম্পদ উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিয়ে শিক্ষাখাতে রেকর্ড ১ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।
এছাড়া স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা।
সামাজিক অবকাঠামো খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ২ লাখ ৭৯ হাজার কোটি টাকা। নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচিতে সাড়ে ১৪ হাজার কোটি টাকা এবং প্রায় ৪২ লাখ কৃষকের জন্য ‘কৃষি কার্ড’ কর্মসূচিতে ১ হাজার ৬২ কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রয়েছে।
জুলাই শহীদ পরিবার ও ধর্মীয় সেবায় বরাদ্দ
বাজেটে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ পরিবারগুলোর জন্য মাসিক ২০ হাজার টাকা ভাতার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। আহতদের জন্য শ্রেণিভেদে মাসিক ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা সহায়তা দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।
এছাড়া দেশের মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন, খাদেম এবং মন্দিরের পুরোহিতদের কল্যাণে ১ হাজার ৮১ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
যোগাযোগ খাতে ৬০ হাজার ৭৩০ কোটি টাকা এবং স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন খাতে ৪১ হাজার ৩৫২ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।
‘গরিবের বাজেট’ প্রত্যাশা
উচ্চ মূল্যস্ফীতি, নিত্যপণ্যের লাগামহীন দাম, আবাসন ব্যয় বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সংকটের কারণে সাধারণ মানুষের প্রধান প্রত্যাশা—দ্রব্যমূল্যের চাপ কমানো।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস)-এর মহাপরিচালক ড. এ কে এনামুল হক বলেছেন, সরকারকে ঋণনির্ভর ব্যয় ব্যবস্থাপনার মধ্যেও বাস্তবমুখী ও কল্যাণমুখী পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে সীমিত আয়ের মানুষ কিছুটা স্বস্তি পায়।
অর্থনীতিবিদদের মতে, নতুন বাজেটের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জনগণের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর ক্ষেত্রে কার্যকর ফল দেখানো।