রাজধানীতে এক বৃদ্ধা মায়ের মৃত্যুর পর সাত দিন ধরে তার মরদেহ বাসায় পড়ে থাকার ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। মৃত নারীর সন্তানদের মধ্যে একজন সচিব, একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং পরিবারের অন্য সদস্যরাও উচ্চশিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত হওয়া সত্ত্বেও এমন ঘটনার প্রেক্ষাপটে সমাজের মূল্যবোধ ও পারিবারিক সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
এ ঘটনায় এক সমাজবিজ্ঞানী ও লেখক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক দীর্ঘ প্রতিক্রিয়ায় বলেন, আমাদের সমাজে সফলতার যে প্রচলিত সংজ্ঞা তৈরি হয়েছে, তা মানুষকে মানবিক মূল্যবোধ থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।
তিনি উল্লেখ করেন, সমাজ ও পরিবার শিশুদের শেখায় কীভাবে বড় পদ-পদবি অর্জন করতে হবে, কিন্তু মানুষ হওয়ার শিক্ষা যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না। তার মতে, একজন সচিব, ডাক্তার, প্রকৌশলী বা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়া ব্যক্তিগত সাফল্যের পরিচায়ক হতে পারে, কিন্তু মানবিক দায়িত্ববোধ ও পারিবারিক সম্পর্কের জায়গায় ব্যর্থতা থাকলে সেই সাফল্য প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
লেখক তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, ছোটবেলায় গৃহকর্মীর সঙ্গে দুর্ব্যবহার করায় তার বাবা তাকে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করেছিলেন। সেই শিক্ষা তাকে মানুষের প্রতি সম্মান দেখানোর মূল্যবোধ শিখিয়েছে।
তিনি দাবি করেন, বর্তমান সমাজে পেশাগত ও আর্থিক সাফল্যকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়ার কারণে অনেক ক্ষেত্রে মানবিক সম্পর্ক দুর্বল হয়ে পড়ছে। পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তরে এই প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
এ প্রসঙ্গে তিনি ২০১৩ সালের পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন উল্লেখ করে বলেন, আইন অনুযায়ী সন্তানদের ওপর বাবা-মায়ের দেখভালের দায়িত্ব রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই সেই দায়িত্ব পালনে অবহেলার অভিযোগ দেখা যায়।
লেখকের মতে, দেশের বিভিন্ন সংকট ও সামাজিক অবক্ষয়ের পেছনে কেবল অশিক্ষা নয়, বরং মূল্যবোধের সংকটও দায়ী। তিনি বলেন, উচ্চশিক্ষা ও উচ্চপদে অধিষ্ঠিত হওয়া মানেই মানবিকতা ও দায়িত্ববোধ নিশ্চিত করা নয়।
ঘটনাটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা চলছে। অনেকেই পারিবারিক বন্ধন, বয়স্কদের প্রতি দায়িত্ববোধ এবং সামাজিক মূল্যবোধের পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরছেন।