দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্টের চূড়ায় উড়ল বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা। বাংলাদেশি পর্বতারোহী নুরুন্নাহার নিম্নি সফলভাবে এভারেস্ট জয় করে দেশের ইতিহাসে নতুন অধ্যায় যোগ করেছেন। বুধবার (২৭ মে) ভোরে তিনি বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ জয় করেন। তাঁর এই অর্জনের খবর নিশ্চিত করেছে বাংলা মাউন্টেইনিয়ারিং অ্যান্ড ট্রেকিং ক্লাব (বিএমটিসি)।
এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের তৃতীয় নারী হিসেবে এভারেস্ট জয় করলেন নুরুন্নাহার নিম্নি। এর আগে ২০১২ সালের ১৯ মে প্রথম বাংলাদেশি নারী হিসেবে এভারেস্টের চূড়ায় ওঠেন নিশাত মজুমদার। একই বছরের ২৬ মে শিখর জয় করেন ওয়াসফিয়া নাজরীন। এরপর দীর্ঘ ১৪ বছর পর আবারও কোনো বাংলাদেশি নারী এভারেস্টের চূড়ায় উঠলেন।
গত ১১ এপ্রিল বাংলাদেশ থেকে নেপালের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন নিম্নি। কাঠমান্ডু হয়ে লুকলা পৌঁছে তিনি এভারেস্ট বেজক্যাম্পে যান। সেখানে কয়েক সপ্তাহ ধরে অতিউচ্চতার পরিবেশের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার প্রশিক্ষণ ও প্রস্তুতি নেন। সাধারণত মে মাসের মাঝামাঝি থেকে শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত সময়কে এভারেস্ট সামিটের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত ধরা হয়।
গত ১৭ মে চূড়ান্ত অভিযানের উদ্দেশ্যে বেজক্যাম্প ত্যাগ করেন নিম্নি। ধাপে ধাপে বিভিন্ন ক্যাম্প অতিক্রম করে ২৩ মে পৌঁছান ক্যাম্প-৪ এ। তবে সেদিন প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে শিখরের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেও ফিরে আসতে বাধ্য হন তিনি। পরে কয়েকদিন ক্যাম্প-২ এ অবস্থান করে অনুকূল আবহাওয়ার অপেক্ষা করেন।
অবশেষে ২৫ মে আবহাওয়া অনুকূলে এলে আবারও নতুন উদ্যমে যাত্রা শুরু করেন নুরুন্নাহার নিম্নি। সোমবার ক্যাম্প-৪ এ পৌঁছে সন্ধ্যার পর শুরু করেন চূড়ান্ত আরোহণ। তীব্র ঠান্ডা, অক্সিজেন সংকট এবং প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে লড়াই করে মঙ্গলবার ভোরে তিনি এভারেস্টের শিখরে পৌঁছাতে সক্ষম হন। সেখানে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উড়িয়ে গৌরবের নতুন ইতিহাস রচনা করেন তিনি। অভিযানে তাঁর সঙ্গে ছিলেন নেপালের এইটকে এক্সপেডিশনের এক শেরপা।
বর্তমানে নুরুন্নাহার নিম্নি পূবালী ব্যাংক পিএলসি’র জেনারেল ব্যাংকিং বিভাগে প্রিন্সিপাল অফিসার হিসেবে কর্মরত আছেন। তাঁর এই অভিযানের স্পনসরও ছিল প্রতিষ্ঠানটি।
রংপুরে বেড়ে ওঠা নিম্নি পড়াশোনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগে। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে ২০০৬ সালে চন্দ্রনাথ পাহাড়ে ফিল্ডওয়ার্কে গিয়ে পাহাড়ের প্রতি গভীর আকর্ষণ তৈরি হয় তাঁর। এরপর ধীরে ধীরে পর্বতারোহণের প্রতি আগ্রহ বাড়তে থাকে।
বান্দরবানের বিভিন্ন পাহাড়ে ভ্রমণের পাশাপাশি ভুটান, ভারতের সিকিম এবং নেপালের বিভিন্ন পর্বতে ট্রেকিংয়ের অভিজ্ঞতা অর্জন করেন তিনি। ২০১৯ সালে নেপালের অস্ট্রেলিয়ান ক্যাম্প ভ্রমণের পর আরও বড় স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন নিম্নি। পরে ২০২০ সালে এভারেস্ট বেজক্যাম্প ট্রেক সম্পন্ন করার পর পেশাদার পর্বতারোহী হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
নিজেকে প্রস্তুত করতে ২০২২ সালে ভারতের দার্জিলিংয়ে অবস্থিত হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টিটিউটে প্রশিক্ষণ নেন তিনি। একই বছর যুক্ত হন বাংলা মাউন্টেইনিয়ারিং অ্যান্ড ট্রেকিং ক্লাবের সঙ্গে।
বাংলাদেশের হয়ে প্রথম এভারেস্ট জয় করেন মুসা ইব্রাহীম। তিনি ২০১০ সালের ২৩ মে এভারেস্টের শিখরে পৌঁছান। এরপর এম এ মুহিত দুবার এভারেস্ট জয় করেন। ২০১৩ সালে এভারেস্ট জয় করেছিলেন সজল খালেদ, তবে ফেরার পথে মৃত্যুবরণ করেন তিনি।
দীর্ঘ বিরতির পর ২০২৪ সালে এভারেস্ট জয় করেন বাবর আলী। আর ২০২৫ সালে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত থেকে হেঁটে এভারেস্ট চূড়ায় পৌঁছে আলোচনায় আসেন ইকরামুল হাসান শাকিল। সেই ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালে বাংলাদেশের একমাত্র অভিযাত্রী হিসেবে এভারেস্ট জয় করে ইতিহাসে নিজের নাম লিখিয়েছেন নুরুন্নাহার নিম্নি।
নুরুন্নাহার নিম্নির এই সাফল্যে দেশজুড়ে আনন্দ ও গর্বের অনুভূতি ছড়িয়ে পড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তাঁকে অভিনন্দন জানাচ্ছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।