দীর্ঘ দুই দশক পর জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সরকার। ২০০৬-০৭ অর্থবছরের পর এবারই প্রথম সরকার পরিচালনার দায়িত্বে থেকে বাজেট ঘোষণা করছে দলটি। ফলে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে শুধু একটি অর্থনৈতিক দলিল নয়, বরং নতুন সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও অর্থনৈতিক দর্শনের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার (১১ জুন) জাতীয় সংসদে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এটি তার প্রথম বাজেট উপস্থাপন।
দুই দশক আগে বিএনপির সর্বশেষ বাজেট উপস্থাপন করেছিলেন প্রয়াত অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান। ৬৯ হাজার ৭৪০ কোটি টাকার সেই বাজেটে বেসরকারি খাতনির্ভর উন্নয়ন, উদ্যোক্তা সৃষ্টি, অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি এবং স্থানীয় সরকার শক্তিশালীকরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে নতুন সরকার এমন এক অর্থনীতি উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে, যেখানে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল ব্যাংকিং খাত, বিনিয়োগে স্থবিরতা, বেকারত্ব বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে রয়েছে।
তারেক রহমান-এর নেতৃত্বে বিএনপির দ্বিতীয় প্রজন্মের সরকারের জন্য এ বাজেটকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, জনগণের প্রত্যাশা এবং বাস্তব অর্থনৈতিক সক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই হবে সরকারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির লক্ষ্য
প্রস্তাবিত বাজেটে সরকার আগামী অর্থবছরে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন এবং গড় মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে সীমিত রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
এ ছাড়া মোট বিনিয়োগ জিডিপির ৩১ দশমিক ৪ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে বেসরকারি বিনিয়োগ ২৪ দশমিক ৯ শতাংশ এবং সরকারি বিনিয়োগ ৬ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে।
নির্বাচনি অঙ্গীকার বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি
সরকারের দাবি, এবারের বাজেটের মূল দর্শন হবে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, বিনিয়োগবান্ধব ও কল্যাণমুখী অর্থনীতির ভিত্তি গড়ে তোলা।
বাজেটে ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যও প্রতিফলিত হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সর্বোচ্চ গুরুত্ব
গত কয়েক বছরে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করেছে। খাদ্য, বাসাভাড়া, পরিবহন, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষাখাতে ব্যয় বৃদ্ধির কারণে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)-এর তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে দেশের বার্ষিক মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে পৌঁছেছে, যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ের একটি।
এ কারণে এবারের বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বাজারে স্বস্তি ফিরিয়ে আনার বিষয়ে জনগণের প্রত্যাশা সবচেয়ে বেশি।
কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা তৈরির পরিকল্পনা
তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দক্ষতা উন্নয়ন এবং উদ্যোক্তা তৈরিকে বাজেটের অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে ধরা হচ্ছে।
সরকার দেশ-বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণ, মানবসম্পদ উন্নয়ন, গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক মানের বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নের ওপর জোর দিচ্ছে।
কৃষি, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষায় গুরুত্ব
প্রস্তাবিত বাজেটে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি শক্তিশালী করার পরিকল্পনা রয়েছে।
ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড এবং অন্যান্য সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রম সম্প্রসারণের মাধ্যমে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সহায়তা বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হতে পারে।
সবার নজর সংসদের দিকে
অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী এবং সাধারণ মানুষের দৃষ্টি এখন জাতীয় সংসদের দিকে। বাজেটটি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং অর্থনীতিতে আস্থা ফিরিয়ে আনতে কতটা কার্যকর রূপরেখা দিতে পারে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
দুই দশক পর ক্ষমতায় ফিরে বিএনপি সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট তাই অর্থনৈতিক পরিকল্পনার পাশাপাশি রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতারও বড় পরীক্ষা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।