মোঃ আমজাদ হোসেন : জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলায় টানা দুই দিনের দীর্ঘ বিদ্যুৎ বিভ্রাটে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন কয়েক হাজার গ্রাহক। সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন পোল্ট্রি খামারি, মৎস্য চাষি, কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, অটোরিকশা চালক, শিক্ষার্থী এবং সাধারণ মানুষ।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ৮ জুন দিবাগত রাত ৩টা থেকে ৯ জুন বিকেল ৩টা পর্যন্ত প্রায় ১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ ছিল। এরপর ১০ জুন সকাল ৬টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত (প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত) বিদ্যুৎ না থাকায় জনদুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, সামান্য বৃষ্টি কিংবা হালকা ঝড় হলেই উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকে। তবে গত দুই দিনের দীর্ঘস্থায়ী বিদ্যুৎ বিপর্যয় পরিস্থিতিকে আরও সংকটময় করে তুলেছে।
ক্ষেতলাল পৌর এলাকার ভাশিলা মহল্লার পোল্ট্রি খামারি সামছুল ইসলাম বলেন, “আমার খামারে প্রায় তিন হাজার মুরগির বাচ্চা রয়েছে। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় অতিরিক্ত গরমে বাচ্চাগুলো স্বাভাবিকভাবে খাবার খেতে পারছে না। এতে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।”
বেলগাড়ী গ্রামের মৎস্য চাষি শাহজাহান আলী বলেন, “বিদ্যুৎ না থাকায় পুকুরে সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। মাছ পরিবহন ও বাজারজাত করতেও সমস্যা হচ্ছে, যা আমাদের জন্য বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে।”
একজন এইচএসসি পরীক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, “পরীক্ষার প্রস্তুতির গুরুত্বপূর্ণ সময়ে বিদ্যুৎ না থাকায় পড়াশোনায় মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটছে। মোবাইল চার্জ দিতে না পারায় প্রয়োজনীয় শিক্ষাসামগ্রীও দেখতে পারছি না।”
ধনকুড়াইল গ্রামের ভ্যানচালক রব্বানী বলেন, “প্রচণ্ড গরমে দিনভর কাজ করার পর বাসায় ফিরে একটু স্বস্তি পাওয়ার উপায় নেই। বিদ্যুৎ না থাকায় রাতে ঘুমানোও কঠিন হয়ে পড়েছে।”
অটোরিকশা চালক রাকিব বলেন, “ব্যাটারি চার্জ দিতে না পারায় নিয়মিত ট্রিপ দিতে পারছি না। ফলে আয় কমে গেছে এবং সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।”
ভুক্তভোগী গ্রাহকদের অভিযোগ, বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণ জানতে ক্ষেতলাল পল্লী বিদ্যুতের অভিযোগ কেন্দ্রের মোবাইল নম্বরে যোগাযোগ করলে অধিকাংশ সময় ফোন ব্যস্ত পাওয়া যায়। কখনও ফোন রিসিভ করা হলেও সন্তোষজনক কোনো তথ্য দেওয়া হয় না। বারবার একই সমস্যার পুনরাবৃত্তি হলেও স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় গ্রাহকদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে।
দীর্ঘ বিদ্যুৎ বিভ্রাটের ফলে মোবাইল ফোন, পানির মোটর, ফ্রিজসহ প্রয়োজনীয় বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার ব্যাহত হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ব্যবসা-বাণিজ্য এবং অনলাইনভিত্তিক বিভিন্ন কার্যক্রমও।
এদিকে বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব পড়েছে ক্ষেতলাল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও। প্রচণ্ড গরমে রোগী ও তাদের স্বজনদের ভোগান্তি বেড়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এ বিষয়ে ক্ষেতলাল সাব-স্টেশনের এরিয়া পরিচালক মাহমুদুল হাসান চৌধুরী রকেট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একাধিক পোস্টের মাধ্যমে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণ এবং চলমান মেরামত কার্যক্রম সম্পর্কে তথ্য জানিয়েছেন।
ক্ষেতলাল সাব-স্টেশনের সহকারী জেনারেল ম্যানেজার (এজিএম) তৌকির আহম্মেদ বলেন, “গত দুই দিন ধরে সামান্য ঝড়বৃষ্টি হলেই ৩৩ কেভি মেইন সঞ্চালন লাইনে ত্রুটি দেখা দিচ্ছে। লাইনের কোথাও ইনসুলেশনজনিত সমস্যা রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ক্ষেতলাল ও জেলা পর্যায়ের একাধিক টিম যৌথভাবে কাজ করছে। তবে এখনও ত্রুটির সুনির্দিষ্ট স্থান শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। দ্রুত সমস্যা সমাধানের চেষ্টা চলছে।”
দীর্ঘদিনের এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন এলাকাবাসী।