আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটের আকার বড় হলেও তা বাস্তবায়ন অসম্ভব নয় বলে মনে করে ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই)। তবে এজন্য সরকারকে দূরদর্শিতা, দক্ষতা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে বলে সংগঠনটি মন্তব্য করেছে।
শনিবার (১৩ জুন) প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট নিয়ে গণমাধ্যমে পাঠানো এক পর্যবেক্ষণে এ মতামত জানায় দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠন এফবিসিসিআই।
পর্যবেক্ষণে বলা হয়, আগামী অর্থবছরের জন্য সরকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করেছে, যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা বা প্রায় ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি। বর্তমান বৈশ্বিক ও ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং নিম্ন আয়ের মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এ বাজেটের আকারকে অবাস্তব মনে করছে না সংগঠনটি।
এফবিসিসিআই আশা প্রকাশ করে, অর্থনীতিতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাজেটে নির্ধারিত ৬ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি এবং ৭ দশমিক ৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে।
রাজস্ব আদায় বড় চ্যালেঞ্জ
সংগঠনটির মতে, প্রস্তাবিত বাজেটে মোট রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ১০ দশমিক ২ শতাংশ। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)-এর ওপর নির্ভর করা হয়েছে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা আদায়ের জন্য।
এফবিসিসিআই বলেছে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ ও অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জের কারণে এ বিশাল রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা হবে। এজন্য ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব রাজস্ব ব্যবস্থা এবং এনবিআরের কার্যকর সংস্কার জরুরি।
ঋণ ও সুদ পরিশোধে চাপ
পর্যবেক্ষণে বলা হয়, বাজেট ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। এ ঘাটতি পূরণে সরকারকে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উভয় উৎস থেকেই ঋণ নিতে হবে।
এফবিসিসিআই সতর্ক করে বলেছে, ব্যাংকিং খাত থেকে অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণ বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই তুলনামূলক কম সুদে বৈদেশিক অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছে সংগঠনটি।
এছাড়া আগামী অর্থবছরে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধ বাবদ মোট ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয় করতে হবে, যা সরকারের জন্য একটি বড় আর্থিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাস্তবায়নে জবাবদিহিতা জরুরি
এফবিসিসিআই বলেছে, বাজেটের সফলতা নির্ভর করবে ঘোষিত সংস্কার কর্মসূচির কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর। এজন্য দক্ষতা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং তদারকি ব্যবস্থার মান উন্নয়নে সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা প্রয়োজন।
সংগঠনটি সরকারি ও বেসরকারি খাতের অংশীদারিত্ব আরও জোরদার করার আহ্বানও জানিয়েছে।
যেসব খাতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ
জাতীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে এফবিসিসিআই কয়েকটি বিষয়ে অগ্রাধিকার দেওয়ার সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে—
- বিনিয়োগবান্ধব অর্থনৈতিক অঞ্চল কার্যকর করা
- রপ্তানি বহুমুখীকরণ ও নতুন বাজার অনুসন্ধান
- আইটি ও ইলেকট্রনিক্স খাতে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা
- ব্যবসার ব্যয় ও প্রশাসনিক জটিলতা কমানো
- পুঁজিবাজার ও বন্ড মার্কেট শক্তিশালী করা
- এডিপি বাস্তবায়নে গুণগত মান ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা
- ব্যাংকিং খাতের সংস্কার ও খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ
- অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো
- নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা
- সরবরাহ ব্যবস্থা ও লজিস্টিক খাত উন্নয়ন
- মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল সংক্রান্ত আইনি কাঠামো গঠন
- ব্লু ইকোনমির সম্ভাবনা কাজে লাগানো
ব্যবসায়ী সংগঠনটির মতে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, কম কর-জিডিপি অনুপাত, খেলাপি ঋণের উচ্চহার, বৈদেশিক ঋণের চাপ এবং বৈশ্বিক অস্থিরতা কাটিয়ে উঠতে পারলেই প্রস্তাবিত বাজেট দেশের অর্থনীতিতে কাঙ্ক্ষিত ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে সক্ষম হবে।