সোনারগাঁ (নারায়ণগঞ্জ) প্রতিনিধি :
চাঁদাবাজির অভিযোগে আটক নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য আজহারুল ইসলাম মান্নানের ছেলে জেলা যুবদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক খাইরুল ইসলাম সজীবকে ছেড়ে দিয়েছে পুলিশ। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) জিজ্ঞাসাবাদ শেষে মুচলেকা নিয়ে রোববার রাত দেড়টায় তাঁকে ছেড়ে দেয়। এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) শফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন,অভিযোগের ভিত্তিতে সজীবকে ডিবিতে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তাঁর বক্তব্য যাচাই বাছাই করার পর মুচলেকা নিয়ে নিয়ে রাত ১টা ৩০মিনিটে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। তবে পুলিশ তাকে ছেড়ে দিলেও তার বিরুদ্ধে সোনারগাঁ ও সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকায় চাঁদাবাজি, দখলবাজি, টেন্ডারবাজি, মেঘনা নদী থেকে অবৈধ বালু উত্তোলনসহ অভিযোগের পাহাড় জমেছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোন প্রকার পদক্ষেপ নেওয়া হয় না। এসব বিষয়ে পদক্ষেপ নিলেই তাকে লাগাম টানা সম্ভব হবে। শুধু সজিবই নয়, তার অনুসারী বিএনপি ও যুবদলের নেতাকর্মীরাও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বিএনপির হাই কমান্ডকে অনুরোধ জানিয়েছেন ভূক্তভোগীরা।
স্থানীয় বিএনপির একাধিক সূত্র থেকে জানা যায়, খায়রুল ইসলাম সজিব নারায়ণগঞ্জ জেলা যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহবায়ক। ৫ই আগষ্টে শেখ হাসিনা ভারতের চলে যাওয়ার পর সারাদেশ অচলাবস্থা বিরাজ করে। পরদিন ৬ আগষ্ট থেকে ৯ আগষ্ট পর্যন্ত মেঘনা টোল প্লাজায় রশিদ ছাড়া টোল আদায় করে এ টাকা লুটে নেয় সজিব ও তার বাহিনী। তিন দিনে প্রায় আড়াই কোটি টাকা টোল প্লাজা থেকে লুটপাট করে এ যুবদল নেতা। মেঘনা নদীতে অবৈধ ভাবে ২০-২৫ টি ড্রেজার বসিয়ে রাতের আধারে বালু লুটের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। তার বাবা আজহারুল ইসলাম মান্নান সোনারগাঁ উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও বর্তমানে নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের সাংসদ হওয়ার কারণে নেতাকর্মীরা তাদের অনুসারী হয়ে কাজ করেন। খায়রুল ইসলাম সজিব ১০টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার জমি দখল, চাঁদাবাজির শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। এসময় সিন্ডিকেটে বিএনপি ও যুবদলের নেতাকর্মীরা দিয়ে গড়ে তোলেন। আওয়ামীলীগ পতনের পর থেকে তিনি মেঘনা গ্রুপের ২৭টি ইউনিটে জুট ব্যবসা নিজের কব্জায় নিয়ে নেন। অভিযোগ রয়েছে, মেঘনা গ্রুপের সকল ইউনিটের জুট, রিজেক্ট টাইলস, সিমেন্টের ব্যাগ,শিপইয়ার্ডের লোহা নাম মাত্র টাকায়, কখনো কখনো টাকা ছাড়াই লুটে নিয়ে যান।
এছাড়াও অভিযোগ রয়েছে জমি রেজিষ্ট্রেশন থেকে সরকারী কোষাগারে জমা ১% এর টাকা সোনারগাঁ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আসিফ আল জিনাত ও প্রকৌলশী আলমগীর হোসেন চৌধুরীর সঙ্গে আঁতত করে ইউনিয়ন পরিষদ এলাকার উন্নয়নের জন্য বরাদ্দের টাকা লুট করে নিয়ে যায়। যেখানে ইউনিয়ন পরিষদের আওতায় বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ হওয়ার কথা থাকলেও উন্নয়নের টাকা লুটে নিয়ে যায়।
প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয়ও তার দখলে রয়েছে। তার বাবা এমপি হলেও সজিবের কথায়ই চলে এ কার্যালয়। তার কথা ছাড়া একটি উন্নয়নমূলক কাজ হয় না। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাও অসহায় হয়ে পড়েছেন। উপজেলার দুটি গুরুত্বপূর্ন এলজিইউডি ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয়ের দায়িত্ব দিয়েছেন পৌরসভা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক সাদেকুল ইসলাম সেন্টুকে। সেন্টুই উপজেলার দুটি কার্যালয়ের কাজ তদারকি করে থাকেন।
অভিযোগ রয়েছে, আষাঢ়িয়ার চর এলাকায় আল মোস্তফা গ্রুপের প্রধান ফটক বন্ধ করে ৩০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন খায়রুল ইসলাম সজিব। টাকা পাওয়ার পরদিনই বেড়া তুলে নেওয়া হয়। তবে এ কাজে সজিবকে সহযোগিতা করেন, সোনারগাঁ উপজেলা বিএনপির সদস্য আলী নূর, পিরোজপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল জলিল।
নেতাকর্মীদের অভিযোগ, খায়রুল ইসলাম সজিবের নেতৃত্বে সোনারগাঁয়ে প্রায় অর্ধ শতাধিক চুনা ও ঢালাই কারখানা গড়ে তুলেছেন। সরকারি গ্যাস অবৈধভাবে সংযোগ নিয়ে এসব কারখানা গড়ে তুলেছেন। প্রতি মাসে প্রতিটি কারখানা থেকে ৫০ হাজার টাকা পেয়ে থাকেন। সজিবের আপন ফুফাতো ভাই হারুন অর রশিদ ও বিএনপি নেতা নেয়ামতউল্লাহর মাধ্যমে এ টাকা গ্রহন করেন।
খায়রুল ইসলাম সজিবের চাঁদাবাজির সকল টাকা আদায় করেন তার বাবার পিএস সেলিম হোসেন দিপু। সজিবের সকল অপকর্মে সহযোগিতা থাকেন এ দিপু। মামলা বানিজ্য থেকে শুরু করে সকল অপকর্মে তার হাত রয়েছে।
বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনে গাড়ি পার্কিং ও নাগরদোলাসহ শিশুদের বিনোদন কেন্দ্রের শিডিউল বিক্রিতে হস্তক্ষেপ করেন খায়রুল ইসলাম সজিব। তার অনুমতি ছাড়া কেউ এসব কাজের শিডিউল ক্রয় করতে পারেননি। নিজের পছন্দের নেতাকর্মীকে এ কাজ পাইয়ে দেওয়ার জন্য এ টেন্ডার হস্তক্ষেপ করেন।
সজিবের আধিপত্যে অসহায় খোদ ইউএনও। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের মাসিক আইনশৃঙ্খলা সভা ও সমন্বয় সভায় সদস্য না হয়েও প্রতিটি সভায় উপস্থিত হয়ে সংসদ সদস্য
বাবা মান্নানের প্রভাবে বক্তব্য রাখছেন। এতে করে সরকারি কর্মকর্তা, ওসি, ইউপি চেয়ারম্যান ও আইনশৃঙ্খলা সভার সদস্যরা বিবৃতিকর পরিস্থিতিতে পড়ছেন।
মেঘনা নদীতে বিভিন্ন বাল্কহেড, কার্গো ও জাহাজ থেকে চাঁদাবাজির নেতৃত্ব দেন সজিব। অবৈধভাবে চাঁদাবাজির অভিযোগে পুলিশ দুই সাংবাদিকসহ ৭ জনকে গ্রেপ্তার করে। এ ঘটনায় মামলাও হয়। মামলা থেকে সজিব ছাড় পেলেও ছাড় পাননি তার সহযোগী যুবদল নেতা সোহাগ, বিএনপি নেতা আলী নূরসহ আরো ৫ জন। এছাড়াও পানি শোধন প্লান্ট ওয়াসার জমি থেকে রাতের আঁধারে সাজিবের নেতৃত্বে স্থানীয় ভারপ্রাপ্ত ইউপি চেয়ারম্যান মামুন মিয়া ও যুবদল নেতা সোহাগ মিয়া বালু কেটে বিক্রি করে দিচ্ছেন
নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার অপরাধ তারেক আল মেহেদী সোমবার দুপুরে জানান, রোববার রাত ২ টার পর তাঁকে ঢাকার গোয়েন্দা কার্যালয়ে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। তাঁকে কি অভিযোগে আটক করা হয়েছিল বা তাঁর কাছ থেকে কী তথ্য পাওয়া গেছে সেটা ঢাকা গোয়েন্দা পুলিশ বলতে পারবে।
রোববার রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার বাসা থেকে ডিবির সহায়তায় নারায়ণগঞ্জ জেলা ডিবি পুলিশ তাঁকে হেফজতে নেয়। প্রথমে তাঁকে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ কার্যালয়ে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পরে অধিকতর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সন্ধ্যায় নেওয়া হয় ঢাকার মিন্টো রোডে ডিবি কার্যালয়ে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) শফিকুল ইসলাম জানান, সজীবের বিরুদ্ধে কিছু লোকজন পুলিশের কাছে চাঁদাবাজির অভিযোগ করেছে। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করার জন্য আমরা তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছি।
নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) তারেক আল মেহেদী জানান, সজীবের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির বেশ কয়েকটি অভিযোগ পাওয়া গেছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে তাঁকে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার বাসা থেকে হেফাজতে নেওয়া হয়। তাঁকে এক ঘণ্টারও বেশি সময় জিজ্ঞাসাবাদের পর সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে ঢাকা মহানগর ডিবি কার্যালয়ে নেওয়া হয়।
এদিকে নানা অনিয়মে জড়িত থাকার সুস্পষ্ট অভিযোগে সজীবকে প্রাথমিক সদস্য পদসহ যুবদল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। রোববার রাতে যুবদলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সহসভাপতি নুরুল ইসলাম সোহেল স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানানো হয়েছে। বিজ্ঞপ্তি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী যুবদল ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে পোস্ট করা হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বহিষ্কৃতদের কোনো অপকর্ম দল নেবে না। যুবদলের সব পর্যায়ের নেতাকর্মীকে সাংগঠনিক সম্পর্ক না রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।