প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সাধারণ মানুষের করের বোঝা কমানো, কালো টাকা সাদা করার বিতর্কিত বিধান প্রত্যাহার এবং দেশীয় শিল্প ও বেসরকারি উচ্চশিক্ষা খাতকে আরও গতিশীল করতে একাধিক সংশোধনী প্রস্তাব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনা এবং অর্থনীতিতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার বিষয়ে সরকারের দৃঢ় অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন তিনি।
সোমবার (২৯ জুন) জাতীয় সংসদে বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকারের এই বাজেট কেবল একটি অর্থবছরের পরিকল্পনা নয়, বরং এটি একটি ‘জাতি পুনর্গঠনের বাজেট’। তিনি দেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সরকারি ও বিরোধী দলের সম্মিলিত ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, অতীতের শাসনামলে বিশেষ করে ব্যাংকিং ও পুঁজিবাজারে অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে জনগণের আস্থা নষ্ট হয়েছিল। বর্তমান সরকার দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগবান্ধব পুঁজিবাজার গড়ে তোলা এবং ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়ন করছে।
বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরানোর বিষয়ে তিনি জানান, ইতোমধ্যে ১৩টি দেশে ২৩টি মিউচুয়াল লিগাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্ট পাঠানো হয়েছে। এছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত ১৫টির বেশি ব্যাংক আন্তর্জাতিক সম্পদ পুনরুদ্ধারকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ৬০টিরও বেশি নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট (এনডিএ) স্বাক্ষর করেছে। আন্তর্জাতিক ও দেশীয় আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এসব অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
কর ব্যবস্থাকে আরও জনবান্ধব করার লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়ানোর প্রস্তাব দেন। তিনি ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ করবর্ষে করমুক্ত আয়ের সীমা ৪ লাখ টাকা, ২০২৮-২৯ ও ২০২৯-৩০ অর্থবছরে ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং ২০৩০-৩১ অর্থবছরে ৫ লাখ টাকা করার আহ্বান জানান।
একই সঙ্গে জমি নিবন্ধনের ক্ষেত্রে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে—এমন জনমনে বিভ্রান্তির প্রেক্ষাপটে সংশ্লিষ্ট বিধানটি সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের জন্য অর্থমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।
শিক্ষা খাতে তিনি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর আরোপিত ১০ শতাংশ কর কমিয়ে ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব দেন। পাশাপাশি গবেষণা, ল্যাঙ্গুয়েজ ল্যাব স্থাপন এবং দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য বিনা বেতনে শিক্ষার সুযোগ বাড়ানোর আহ্বান জানান।
জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি হওয়ায় ব্যাংক হিসাব খোলা, সম্পত্তি নিবন্ধন এবং মিউটেশনের ক্ষেত্রে টিআইএন সনদ বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব প্রত্যাহারেরও অনুরোধ করেন তিনি। এছাড়া ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর আয় করমুক্ত করার প্রস্তাবও দেন প্রধানমন্ত্রী।
স্টার্টআপ খাতের জন্য ৫০০ কোটি টাকার তহবিলকে স্বাগত জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এটি তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে। পাশাপাশি ওটিটি প্ল্যাটফর্ম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং সার্চ ইঞ্জিনে বিজ্ঞাপনের ওপর ভ্যাট ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব দেন, যাতে বৈধ চ্যানেলে লেনদেন বাড়ে এবং সরকারের রাজস্বও বৃদ্ধি পায়।
দেশীয় শিল্পের বিকাশে তিনি চিংড়ি শিল্প, ওষুধশিল্প, বৈদ্যুতিক তার, পিভিসি, পেট রেজিন, ফায়ার ডোর, কাজুবাদাম প্রক্রিয়াজাত শিল্পসহ বিভিন্ন খাতে আমদানি শুল্ক ও ভ্যাট কমানোর সুপারিশ করেন। একই সঙ্গে স্থানীয়ভাবে এলইডি ল্যাম্প ও প্রি-ফ্যাব্রিকেটেড ভবন উৎপাদনে কাঁচামাল আমদানির রেয়াতি সুবিধা ২০৩০ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর আহ্বান জানান।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা জোরদারে সুপ্রিম কোর্টের জন্য অতিরিক্ত ১০০ কোটি টাকা এবং আইন মন্ত্রণালয়ের জন্য আরও ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করেন প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত, দক্ষ ও সৎ জনপ্রশাসন গড়ে তোলার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে বিরোধীদলীয় নেতার প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে পরিবেশবান্ধব যান হিসেবে পরিচিত সাইকেলের ওপর সব ধরনের শুল্ক প্রত্যাহারের বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনার জন্য অর্থমন্ত্রীকে নির্দেশনা দেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে জুলাই সনদকে সামনে রেখে সংবিধান সংস্কারসহ একটি ন্যায়ভিত্তিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে জাতীয় ঐক্যের আহ্বান জানান তিনি।