দেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা মেটাতে এবং ব্যয়বহুল এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা কমাতে দেশীয় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। স্থলভাগের পাশাপাশি বঙ্গোপসাগরেও তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান জোরদারে নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে জ্বালানি খাতকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশীয় তেল-গ্যাস অনুসন্ধান, উৎপাদন বৃদ্ধি, পরিশোধন সক্ষমতা সম্প্রসারণ এবং আমদানির উৎস বহুমুখীকরণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে অনশোর ও অফশোর—উভয় ক্ষেত্রেই অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্সের সক্ষমতা বাড়ানোর কথা জানান তিনি।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশে আবিষ্কৃত গ্যাসক্ষেত্রগুলোতে উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের পরিমাণ প্রায় ২৯ দশমিক ৭৪ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ)। এর মধ্যে প্রায় ২২ দশমিক ১১ টিসিএফ গ্যাস উত্তোলন করা হয়েছে। বর্তমানে অবশিষ্ট মজুত রয়েছে প্রায় ৭ দশমিক ৬৩ টিসিএফ, যা বর্তমান উৎপাদন হারে আরও এক দশকের কিছু বেশি সময় দেশের চাহিদা পূরণে সক্ষম হতে পারে।
বর্তমানে দেশের প্রায় ৯৫ শতাংশ পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানিনির্ভর। এছাড়া মোট গ্যাস চাহিদার প্রায় ৩৪ শতাংশ এলএনজি আমদানির মাধ্যমে পূরণ করা হচ্ছে। এলপিজির প্রায় পুরো চাহিদাও বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি বা সরবরাহ বিঘ্নিত হলে দেশের জ্বালানি খাত চাপে পড়ে।
দেশীয় অনুসন্ধান জোরদারে বাপেক্সের কার্যক্রমও সম্প্রসারণ করা হয়েছে। পেট্রোবাংলার চলমান কর্মসূচির আওতায় ২৬টি কূপে কাজ শেষ হয়েছে। এছাড়া ২০২৫-২৬ থেকে ২০২৭-২৮ মেয়াদে ৬৯টি নতুন কূপ খনন এবং ৩১টি কূপে ওয়ার্কওভার করার পরিকল্পনা রয়েছে। অনুসন্ধান কার্যক্রমে গতি আনতে দুটি নতুন এক্সপ্লোরেশন রিগ সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ২ডি ও ৩ডি সিসমিক জরিপও সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।
সমুদ্রাঞ্চলে অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে সরকার ‘অফশোর বিডিং রাউন্ড-২০২৬’ ঘোষণা করেছে। এর আওতায় বঙ্গোপসাগরের ২৬টি সমুদ্র ব্লক বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ১১টি অগভীর এবং ১৫টি গভীর সমুদ্র ব্লক রয়েছে।
পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মাইনস) প্রকৌশলী মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, দেশীয় সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে গ্যাস অনুসন্ধানে জোর দেওয়া হচ্ছে। নতুন কূপ খনন ও সমুদ্রে অনুসন্ধানের মাধ্যমে আমদানিনির্ভরতা কমানোই সরকারের মূল লক্ষ্য।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, গভীর সমুদ্রে উল্লেখযোগ্য গ্যাস মজুতের সন্ধান মিললে দীর্ঘমেয়াদে আমদানিনির্ভরতা কমবে, বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় হ্রাস পাবে এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে। তবে গভীর সমুদ্রে অনুসন্ধান ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোকে আকৃষ্ট করতে উৎপাদন বণ্টন চুক্তিতে (পিএসসি) বিভিন্ন প্রণোদনা যুক্ত করেছে সরকার।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশীয় অনুসন্ধানই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে অনুসন্ধান চালালেই যে গ্যাস পাওয়া যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। এই কার্যক্রমের মাধ্যমে দেশের প্রকৃত গ্যাসসম্পদ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে, যা ভবিষ্যৎ জ্বালানি পরিকল্পনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।