স্প্যানিশ ফুটবলের দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী বার্সেলোনা ও রিয়াল মাদ্রিদের লড়াই মানেই উত্তেজনা, রোমাঞ্চ আর নতুন ইতিহাসের হাতছানি। মৌসুমের প্রথম এল ক্লাসিকোকে ঘিরে এবারও ফুটবলপ্রেমীদের আগ্রহের কেন্দ্রে রয়েছে একাধিক রেকর্ডের সমীকরণ। দুর্দান্ত ছন্দে থাকা বার্সেলোনার সামনে যেমন টানা জয়ের নতুন ইতিহাস গড়ার সুযোগ, তেমনি সেই জয়যাত্রা থামিয়ে শিরোপার লড়াই জমিয়ে তোলার লক্ষ্য রিয়াল মাদ্রিদের।
দীর্ঘ ১৩ বছর পর এল ক্লাসিকোর মঞ্চে কোচ হিসেবে ফিরছেন পর্তুগিজ কোচ হোসে মরিনহো। একসময় বার্সেলোনার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে ওঠা এই কোচ এবার রিয়ালকে নিয়ে মাঠে নামছেন হান্সি ফ্লিকের দলের বিপক্ষে। বাংলাদেশ সময় সোমবার রাত ২টায় বার্সেলোনার মাঠ ক্যাম্প ন্যুতে শুরু হওয়ার কথা মৌসুমের প্রথম এই মহারণ।
লা লিগায় প্রথম নয় ম্যাচের সবকটিতে জিতে ২৭ পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষে রয়েছে বার্সেলোনা। অন্যদিকে ২১ পয়েন্ট নিয়ে তৃতীয় স্থানে রিয়াল মাদ্রিদ। এই ম্যাচে বার্সেলোনা জিতলে দুই দলের ব্যবধান বেড়ে দাঁড়াবে নয় পয়েন্টে। আর রিয়াল জয় পেলে ব্যবধান কমে হবে মাত্র তিন পয়েন্ট। ফলে শিরোপার দৌড়ে দুই দলের অবস্থান নির্ধারণে ম্যাচটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
চলতি মৌসুমে লা লিগায় অপ্রতিরোধ্য বার্সেলোনার একমাত্র হার এসেছে চ্যাম্পিয়নস লিগে পিএসজির বিপক্ষে ৪-২ গোলে। তবে ঘরোয়া লিগে তাদের জয়যাত্রা থামেনি। বিপরীতে রিয়াল মাদ্রিদের লক্ষ্য, চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীদের মাঠে জয় তুলে নিয়ে নিজেদের শিরোপার সম্ভাবনা আরও জোরালো করা। ম্যাচটির আগে আলাদা নজর থাকবে দুই তরুণ ও তারকা ফুটবলার লামিন ইয়ামাল ও কিলিয়ান এমবাপ্পের দিকেও।
এখন পর্যন্ত সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ২৬৪টি আনুষ্ঠানিক এল ক্লাসিকোতে দুই দলই ১০৬টি করে জয় পেয়েছে। বাকি ৫২টি ম্যাচ শেষ হয়েছে ড্রয়ে। ফলে এবারের ম্যাচে যে দল জিতবে, তারা এল ক্লাসিকোর ইতিহাসে মোট জয়ের সংখ্যায় এককভাবে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাবে। দুই দলের দীর্ঘ প্রতিদ্বন্দ্বিতার ইতিহাসে এটি হতে পারে উল্লেখযোগ্য এক মাইলফলক।
ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সেও রেকর্ডের হাতছানি রয়েছে বার্সেলোনার তরুণ তারকা লামিন ইয়ামালের সামনে। চলতি লা লিগায় প্রথম নয় ম্যাচে আট গোল করেছেন তিনি। একবিংশ শতাব্দীতে লিগের প্রথম নয় ম্যাচে অনূর্ধ্ব-২০ বছর বয়সী কোনো ফুটবলারের এত গোল করার নজির নেই বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। শুধু গোল করাই নয়, সতীর্থদের দিয়ে গোল করানোর ক্ষেত্রেও দুর্দান্ত ছন্দে রয়েছেন ইয়ামাল।
গত ৩১ আগস্ট থেকে ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগের ফুটবলারদের মধ্যে গোল ও অ্যাসিস্ট মিলিয়ে সবচেয়ে বেশি অবদানও ইয়ামালের। এই সময়ে তাঁর সরাসরি অবদান ১৪টি গোলে। ১১টি গোলে অবদান রেখে তালিকার পরের অবস্থানে রয়েছেন তাঁর বার্সেলোনা সতীর্থ রাফিনিয়া। এল ক্লাসিকোর মতো বড় মঞ্চে ইয়ামালের পারফরম্যান্স তাই ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
অন্যদিকে বার্সেলোনার বিপক্ষে গোল করার ক্ষেত্রে এমবাপ্পের পরিসংখ্যানও বেশ শক্তিশালী। সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ১০ ম্যাচে কাতালান ক্লাবটির বিপক্ষে ১২ গোল করেছেন ফরাসি তারকা। এর মধ্যে পিএসজির হয়ে তিন ম্যাচে চারটি এবং রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে সাত ম্যাচে আটটি গোল করেছেন তিনি। একবিংশ শতাব্দীতে বার্সেলোনার বিপক্ষে তাঁর চেয়ে বেশি গোল করেছেন কেবল ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো ও করিম বেনজেমা। রোনালদোর গোলসংখ্যা ২০ এবং বেনজেমার ১৬।
দলীয় অর্জনের দিক থেকেও বার্সেলোনার সামনে রয়েছে ঐতিহাসিক সুযোগ। লা লিগার ইতিহাসে মৌসুমের প্রথম নয় ম্যাচ জেতা দ্বিতীয় দল তারা। এর আগে ১৯৬৮-৬৯ মৌসুমে এই কীর্তি গড়েছিল রিয়াল মাদ্রিদ। এবার বার্সেলোনা জয় পেলে লিগের ইতিহাসে প্রথম দল হিসেবে মৌসুমের শুরুতে টানা ১০ ম্যাচ জয়ের নজির গড়বে।
গোল করার ক্ষেত্রেও দুর্দান্ত অবস্থানে রয়েছে ফ্লিকের দল। লা লিগার প্রথম নয় ম্যাচে ৩৯ গোল করেছে বার্সেলোনা। স্প্যানিশ লিগের ইতিহাসে একই সময়ের মধ্যে এর চেয়ে বেশি গোল করার নজির রয়েছে কেবল সেভিয়ার। ১৯৪০-৪১ মৌসুমে প্রথম নয় ম্যাচে ৪২ গোল করেছিল দলটি। ফলে এবারের এল ক্লাসিকোতে গোলের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারলে বার্সেলোনার সামনে আরও একটি রেকর্ডের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
নিজেদের মাঠে রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে টানা জয়ের রেকর্ড গড়ার সুযোগও রয়েছে বার্সেলোনার। ক্যাম্প ন্যুতে লা লিগার সর্বশেষ দুই ম্যাচেই রিয়ালকে হারিয়েছে তারা। এবার জিততে পারলে ঘরের মাঠে টানা তিনটি লিগ ক্লাসিকো জয়ের কীর্তি গড়বে কাতালানরা। একবিংশ শতাব্দীতে পেপ গার্দিওলার অধীনে ২০০৮ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে একবারই এমন সাফল্য পেয়েছিল দলটি।
তবে বার্সেলোনার মাঠে সাম্প্রতিক কয়েকটি ম্যাচের পরিসংখ্যান রিয়ালকেও আশাবাদী করতে পারে। লা লিগায় বার্সেলোনার মাঠে সর্বশেষ ছয় ম্যাচের তিনটিতেই জয় পেয়েছে মাদ্রিদের ক্লাবটি। অথচ এর আগের ১৬ সফরে তাদের জয় ছিল মাত্র তিনটি। ওই সময়ের মধ্যে ছয়টি ম্যাচ ড্র হয়েছিল এবং সাতটিতে হেরেছিল রিয়াল। এই পরিসংখ্যান বলছে, বার্সেলোনার মাঠে সাম্প্রতিক সময়ে রিয়ালও নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে।
কোচ মরিনহোর জন্যও ম্যাচটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। দীর্ঘ ১৩ বছর পর এল ক্লাসিকোতে কোচের দায়িত্ব পালন করতে যাচ্ছেন তিনি। রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে নিজের প্রথম মেয়াদের শেষ পাঁচটি ক্লাসিকোতে অপরাজিত ছিলেন এই পর্তুগিজ কোচ। ওই পাঁচ ম্যাচের তিনটিতে জয় পেয়েছিল তাঁর দল, বাকি দুটি হয়েছিল ড্র।
এবার বার্সেলোনার বিপক্ষে না হারতে পারলে রিয়াল মাদ্রিদের ইতিহাসে তৃতীয় কোচ হিসেবে টানা ছয়টি এল ক্লাসিকোতে অপরাজিত থাকার কীর্তি গড়বেন মরিনহো। এর আগে মিগেল মুনিওস টানা সাতটি ক্লাসিকোতে জয় পেয়েছিলেন। আর ভিসেন্তে দেল বস্কের অধীনে রিয়াল টানা সাত ম্যাচে অপরাজিত ছিল, যার মধ্যে ছিল দুটি জয় ও পাঁচটি ড্র।
সব মিলিয়ে এবারের এল ক্লাসিকো শুধু তিন পয়েন্টের লড়াই নয়; এটি দুই দলের ঐতিহাসিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ব্যক্তিগত অর্জন এবং একাধিক রেকর্ডের পরীক্ষাও। বার্সেলোনা কি নিজেদের জয়যাত্রা অব্যাহত রেখে নতুন ইতিহাস গড়বে, নাকি মরিনহোর রিয়াল মাদ্রিদ চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীদের থামিয়ে শিরোপার লড়াইয়ে নতুন মোড় আনবে—সেই উত্তর মিলবে মাঠের লড়াইয়েই।