ইউক্রেন-পোল্যান্ড সীমান্তের কাছে ইয়াহোদিন স্টেশনে একটি যাত্রীবাহী ট্রেনের ইঞ্জিনে রুশ ড্রোন হামলার ঘটনায় ইউরোপজুড়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। হামলার কিছুক্ষণ আগেই একই রেলপথ দিয়ে যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন, সুইডেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী কার্ল বিল্ড এবং ইউরোপীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের বহনকারী একটি বিশেষ কূটনৈতিক ট্রেন স্টেশনটি ছেড়ে যায়। পরে হামলার আশঙ্কায় আক্রান্ত ট্রেনের যাত্রীদের সরিয়ে নেওয়া হলে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) ইউক্রেনের ভলিন অঞ্চলে পোল্যান্ড সীমান্ত থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে এই হামলা হয়। ইউক্রেনের রাষ্ট্রীয় রেলওয়ে সংস্থা উকর্জালিজনিতসিয়া জানিয়েছে, একটি যাত্রীবাহী ট্রেনের লোকোমোটিভে ড্রোন আঘাত হানে। আগাম সতর্কবার্তা পাওয়ায় ট্রেনের যাত্রী ও কর্মীদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়।
এর আগে কিয়েভে অনুষ্ঠিত ‘ইয়াল্টা ইউরোপিয়ান স্ট্র্যাটেজি’ (YES) সম্মেলন শেষে বরিস জনসনসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সাবেক ও বর্তমান নিরাপত্তা কর্মকর্তারা ওই বিশেষ ট্রেনে করে ইউক্রেন ছাড়ছিলেন। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন সুইডেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী কার্ল বিল্ড এবং অন্যান্য ইউরোপীয় প্রতিনিধি।
উকর্জালিজনিতসিয়ার ধারণা, কূটনৈতিক ট্রেনটিও হামলার সম্ভাব্য লক্ষ্য হয়ে থাকতে পারে। সংস্থাটি জানিয়েছে, রুশ হামলার আশঙ্কার কারণে রেল চলাচলের সময়সূচি তাৎক্ষণিকভাবে পরিবর্তন করা হয় এবং কূটনৈতিক ট্রেনটি নির্ধারিত সময়ের আগেই স্টেশন ছেড়ে যায়। এর কয়েক মিনিট পরই অন্য একটি ট্রেনের লোকোমোটিভে ড্রোন আঘাত হানে। তবে কূটনৈতিক ট্রেনটিই রাশিয়ার মূল লক্ষ্য ছিল—এমন কোনো চূড়ান্ত প্রমাণ এখনো প্রকাশ হয়নি।
সাবেক সুইডিশ প্রধানমন্ত্রী কার্ল বিল্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, তাঁদের বহনকারী ট্রেনটি হামলার আগে ওই এলাকা অতিক্রম করেছিল। সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার পর তারা নিরাপদে পোল্যান্ড সীমান্তের দিকে এগিয়ে যান। সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনও হামলার নিন্দা করে এটিকে বেসামরিক রেল অবকাঠামোর ওপর ‘অর্থহীন’ হামলা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
ঘটনার সময় সাবেক সিআইএ পরিচালক ডেভিড পেট্রায়াসসহ আরও কয়েকজন উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিও ওই অঞ্চলে ছিলেন। তবে তাঁদের বহনকারী আরেকটি ট্রেন হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। পুরো ঘটনায় কোনো যাত্রী বা ট্রেনকর্মী হতাহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি।
রেলপথে হামলার পাশাপাশি ইউক্রেন-পোল্যান্ড সীমান্তের কাছাকাছি এলাকায় একটি ট্রাকেও ড্রোন আঘাত হানে। পোলিশ সীমান্তরক্ষী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ঘটনাটি সীমান্ত থেকে প্রায় ৮০০ মিটার দূরে ঘটে। ওই হামলার কারণে সাময়িকভাবে ইয়াহোদিন-দোরোহুস্ক সীমান্ত ক্রসিংয়ের কার্যক্রম ব্যাহত হয়।
ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহা এ ঘটনাকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটোর সীমান্তের জন্য গুরুতর হুমকি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। পোল্যান্ডের কাছাকাছি এলাকায় রুশ হামলার ঘটনায় দেশটির নিরাপত্তা নিয়েও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ইউক্রেনের দাবি, রাশিয়া সাম্প্রতিক সময়ে দেশটির রেল নেটওয়ার্ক ও সীমান্তসংলগ্ন পরিবহন অবকাঠামোর ওপর হামলা বাড়িয়েছে। অন্যদিকে রাশিয়ার পক্ষ থেকে এসব হামলার লক্ষ্য হিসেবে ইউরোপীয় সামরিক সরঞ্জাম পরিবহনে ব্যবহৃত অবকাঠামোর কথা বলা হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
২০২২ সালে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার হামলা শুরুর পর ইউক্রেনে বিমান চলাচল বন্ধ থাকায় দেশটির অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগে রেলপথের গুরুত্ব অনেক বেড়েছে। বিশেষ করে কিয়েভ ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশের মধ্যে কূটনৈতিক যাতায়াতেও ট্রেন গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠেছে। ফলে পোল্যান্ড সীমান্তের এত কাছে রেলপথে হামলার ঘটনা ইউক্রেনের পাশাপাশি ইউরোপীয় নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়েও নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
কূটনৈতিক ট্রেনটি অল্প সময়ের ব্যবধানে হামলার এলাকা পার হয়ে যাওয়ায় বড় ধরনের বিপর্যয় এড়ানো গেছে। তবে এই ঘটনায় ইউক্রেনের রেল যোগাযোগের নিরাপত্তা এবং ন্যাটো সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় রুশ হামলার ঝুঁকি নিয়ে ইউরোপীয় দেশগুলোর উদ্বেগ আরও বাড়তে পারে।












