রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনার পর ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ মুছে ফেলার অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী সাংবাদিকদের অভিযোগ, হামলার গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলো শহীদ জিয়াউর রহমান হলের সামনের ক্যামেরায় ধারণ হওয়ার কথা থাকলেও পরে সেই ফুটেজ আর পাওয়া যায়নি। হামলার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় ও ঘটনার প্রকৃত চিত্র আড়াল করতেই ফুটেজ সরিয়ে ফেলা হয়েছে বলে তাঁরা দাবি করেছেন।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন শহীদ জিয়াউর রহমান হলের প্রাধ্যক্ষ ড. মাহবুবুর রহমান। তাঁর দাবি, হলের সংস্কারকাজ চলায় ওই সময়ে সিসিটিভি ব্যবস্থার সংযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। ফলে ঘটনার কোনো ভিডিও ফুটেজ থাকার কথা নয়। ফুটেজ মুছে ফেলার অভিযোগকে তিনি সম্পূর্ণ মিথ্যা বলে দাবি করেছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) ড. আবদুল আলীম বলেছেন, প্রয়োজনীয় তথ্য ও নথি সংরক্ষিত রয়েছে। তাঁর ভাষ্য, অভিযোগ যে কেউ করতে পারেন এবং তদন্ত কমিটি প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ করছে। তবে সিসিটিভি ফুটেজ মুছে ফেলার অভিযোগ কিংবা হল প্রাধ্যক্ষের দাবি অনুযায়ী ক্যামেরার সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার বিষয়ে তিনি সরাসরি কোনো মন্তব্য করেননি।
এর আগে রোববার (৪ অক্টোবর) রাত সাড়ে ৮টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ জিয়াউর রহমান হলের সামনে সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় চার সাংবাদিকসহ অন্তত ১০ জন আহত হন। আহত সাংবাদিকেরা হলেন—বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের আরিফ উজ্জামান কোরবান, আগামীর সময়ের জাহিদুল ইসলাম, দ্য ডেইলি স্টারের নূর আহসান মৃদুল এবং দৈনিক সমকালের মাঈনুল ইসলাম রাজু। তাঁদের বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়া হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের কয়েকজন নেতা-কর্মী দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হলের সামনে জড়ো হন। সেখানে সাংবাদিকেরা ঘটনাটি ভিডিও ধারণ করতে গেলে তাঁদের ওপর হামলা করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। হামলার সময় রামদা, চাপাতি, হকিস্টিক, পাইপ ও বেসবল ব্যাটসহ বিভিন্ন দেশীয় অস্ত্র দেখা গেছে বলেও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন।
ঘটনার সূত্রপাত নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, রাকসুর জিএস সালাহউদ্দিন আম্মারকে নিয়ে ছাত্রদল নেতা এম আহসান হাবীবের একটি ফেসবুক পোস্টের মন্তব্যকে কেন্দ্র করে বিরোধের শুরু হয়। আহসান হাবীবের অভিযোগ, ওই পোস্টের মন্তব্যে রাকসুর সহসাংস্কৃতিক সম্পাদক রাকিবুল ইসলাম তাঁর মা ও বোনকে নিয়ে গালিগালাজ করেছেন। অন্যদিকে রাকিবুলের দাবি, তাঁকে মারধরের হুমকি দিয়ে অবস্থান জানতে চেয়েছিলেন আহসান হাবীব। পরে দুজন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দেন। সেই বিরোধের জেরেই হামলার ঘটনা ঘটে বলে বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানিয়েছে।
ঘটনার পর হামলায় জড়িতদের গ্রেপ্তার, প্রশাসনের পক্ষ থেকে মামলা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিতসহ তিন দফা দাবি জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত সাংবাদিকেরা। তাঁদের দাবির পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন মামলা করার আশ্বাস দিয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে সাংবাদিকেরা সাময়িকভাবে কর্মসূচি থেকে সরে দাঁড়ালেও হামলাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি বহাল রেখেছেন।
এদিকে হামলার ঘটনা তদন্তে কেন্দ্রীয় ছাত্রদলও দুই সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহী জানিয়েছেন, বিষয়টি কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে জানানো হয়েছে এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অন্যদিকে, বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতি হামলার দায় ছাত্রশিবিরের ওপর চাপিয়েছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে। তবে হামলার ঘটনায় ছাত্রশিবিরের সংশ্লিষ্টতার কোনো স্বাধীন প্রমাণ এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। হামলার ভিডিও ও ছবিতে ছাত্রদলের কয়েকজন নেতা-কর্মীকে দেখা যাওয়ার দাবি উঠলেও প্রকৃত দায় ও ঘটনার পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপট নির্ধারণে তদন্তের ফলাফলের অপেক্ষা রয়েছে।
সিসিটিভি ফুটেজ নিয়ে তৈরি হওয়া নতুন অভিযোগের ফলে ঘটনার তদন্ত আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একদিকে হল প্রশাসন বলছে, সংস্কারকাজের কারণে ক্যামেরা সংযুক্ত ছিল না; অন্যদিকে সাংবাদিকদের দাবি, ঘটনার গুরুত্বপূর্ণ আলামত হিসেবে ফুটেজ থাকার কথা। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের তদন্ত এবং আইনগত পদক্ষেপের মাধ্যমেই শেষ পর্যন্ত কোন বক্তব্য সঠিক, তা স্পষ্ট হওয়ার কথা।












