একসময় চরমপন্থিদের রক্তাক্ত তৎপরতায় আতঙ্কের জনপদে পরিণত হয়েছিল দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল। সেই পুরোনো আতঙ্কই যেন নতুন করে ফিরে আসার শঙ্কা তৈরি হয়েছে খুলনায়। মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে জেলার দিঘলিয়া ও রূপসা উপজেলায় গুলি করে দুজনকে হত্যার ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে।
রোববার ৪ অক্টোবর দিঘিয়ার ফরমাইশখানা এলাকায় পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি (এমএল-জনযুদ্ধ)-এর আঞ্চলিক নেতা নাসিমুল গণি করিম ওরফে নাসিম, ৫৫, এবং পরদিন সোমবার ৫ অক্টোবর রাতে রূপসার দুর্জনীমহল এলাকায় বাস শ্রমিক আক্তার ঢালী, ৫৮, গুলিতে নিহত হন।
পরপর দুটি হত্যাকাণ্ডের পর স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হলেও পুলিশ বলছে, প্রাথমিকভাবে দুটি ঘটনাকেই নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে সংঘটিত ‘টার্গেট কিলিং’ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
৪ অক্টোবর বেলা পৌনে ১২টার দিকে ফরমাইশখানা এলাকায় নিজের বাড়ির সামনে একটি দোকানে চা পান করছিলেন নাসিম। এ সময় সন্ত্রাসীরা তাকে গুলি করে পালিয়ে যায়। ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।
হত্যাকাণ্ডের ৭২ ঘণ্টা পরও কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। স্থানীয়দের অভিযোগ, ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজে হামলাকারীদের চেহারা দেখা গেলেও এখনো তাদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। এতে পুলিশের তৎপরতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।
সোমবার রাতে নাসিমের স্ত্রী মোসাম্মাৎ সেলিনা খাতুন বাদী হয়ে অজ্ঞাতপরিচয় ৭ থেকে ৮ জনকে আসামি করে হত্যা মামলা করেন।
খুলনা জেলা পুলিশ সুপার সরকার ওমর ফারুক জানিয়েছেন, প্রাথমিক তদন্তে নাসিমের সঙ্গে ভৈরব নদকেন্দ্রিক জ্বালানি তেল পাচার চক্রের ভাগবাটোয়ারা নিয়ে বিরোধের বিষয়টি সামনে এসেছে। স্থানীয় একটি গোষ্ঠীর সঙ্গেও তার দ্বন্দ্ব ছিল বলে তথ্য পাওয়া গেছে। পাশাপাশি ‘ঠাণ্ডা পীর’ নামে পরিচিত এক শীর্ষ চরমপন্থির ছেলের সঙ্গে নাসিমের বিরোধের বিষয়টিও তদন্ত করা হচ্ছে।
পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাস্থল থেকে ভিডিও ফুটেজসহ বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
এর মধ্যেই সোমবার সন্ধ্যার পর রূপসার দুর্জনীমহল শহীদের মোড় এলাকায় ঢালী বাড়ির সামনে গুলিতে নিহত হন বাস শ্রমিক আক্তার ঢালী। মঙ্গলবার দুপুরে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত এ ঘটনায় কোনো মামলা হয়নি।
পুলিশ সুপার জানান, গত ১৫ আগস্ট আক্তারের বড় ছেলে জয় ঢালীকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ওই হত্যা মামলার বাদী ছিলেন আক্তার। এ ঘটনায় একজনকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠিয়েছিল পুলিশ।
এরপর গত ২১ সেপ্টেম্বর রূপসা থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন আক্তার। সেখানে তিনি অভিযোগ করেন, ছেলে হত্যার মামলা তুলে নেওয়ার জন্য তাকে হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
জিডিতে আক্তার অভিযোগ করেন, ১৮ সেপ্টেম্বর সেনের বাজারে কর্মরত অবস্থায় কয়েকজন তাকে এক পাশে ডেকে নিয়ে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য চাপ দেয় এবং হত্যার ভয় দেখায়। তার দাবি ছিল, ছেলে হত্যা মামলার আসামিরা উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিয়ে এলাকায় ফিরে এসে মামলা প্রত্যাহারের জন্য তাকে ও তার পরিবারকে চাপ দিচ্ছে এবং জানমালের ক্ষতির হুমকি দিচ্ছে। নিরাপত্তার জন্য তিনি আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন করেছিলেন।
খুলনা জেলা পুলিশ সুপার বলেন, আপাতত এই হুমকির বিষয়টিকেই সামনে রেখে আক্তার হত্যার তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এটিকেও প্রাথমিকভাবে ‘টার্গেট কিলিং’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তার ভাষ্য, খুলনায় সাম্প্রতিক সময়ে বেশির ভাগ হত্যাকাণ্ডই নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে সংঘটিত হচ্ছে। ইতোমধ্যে একজন পেশাদার হত্যাকারীর সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে এবং তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
নিহত আক্তারের ছোট ভাই আতাউল ঢালী বলেন, তার ভাই রূপসার সেনের বাজারে বাসের কলারম্যান হিসেবে কাজ করতেন। তার কোনো ব্যক্তিগত শত্রু ছিল না। ভাইপো জয় হত্যা মামলার বাদী হওয়ার কারণেই তাকে হত্যা করা হয়েছে বলে তারা মনে করছেন।
আতাউলের ভাষ্য, ঘটনার সময় এলাকায় বিদ্যুৎ থাকলেও গুলি করার সময় বাড়ির ভেতর ও বাইরের বাতি বন্ধ হয়ে যায়। পরে অন্ধকারের মধ্যেই আক্তারকে হত্যা করা হয়। এ ঘটনার পর পরিবারের সদস্যরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
পরপর দুই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় রূপসা ও দিঘলিয়ার বাসিন্দাদের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। স্থানীয়দের একটি অংশ মনে করছে, নিষিদ্ধ চরমপন্থি সংগঠনগুলোর তৎপরতা আবারও বাড়তে পারে। তবে এখন পর্যন্ত পুলিশি তদন্তে এসব হত্যাকাণ্ডকে চরমপন্থি সংগঠনের নতুন উত্থান হিসেবে নিশ্চিত করা হয়নি।
স্থানীয়দের ভাষ্য, একসময় রূপসা-দিঘলিয়া এলাকায় লাল পতাকা, বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি, নিউ বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি, পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি এবং পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি (এমএল-জনযুদ্ধ)সহ বিভিন্ন চরমপন্থি সংগঠনের তৎপরতা ছিল। পারস্পরিক বিরোধ ও সংঘাতের জেরে নিয়মিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও ঘটত।
সাম্প্রতিক দুই হত্যাকাণ্ডের পর সেই অতীত পরিস্থিতি ফিরে আসার আশঙ্কায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এখন তদন্তে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ, জড়িতদের পরিচয় এবং এর সঙ্গে কোনো সংঘবদ্ধ চক্র বা পুরোনো চরমপন্থি নেটওয়ার্কের যোগসূত্র রয়েছে কি না, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।










