জাপানের শীর্ষস্থানীয় বহুজাতিক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান মারুবেনি কর্পোরেশনের প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মাসায়ুকি ওমোটোর নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছে। রোববার (১১ অক্টোবর) সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য জোরদার এবং প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, সার ও জ্বালানি খাতে সহযোগিতার নতুন সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়।
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, দেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তাদের জন্য বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে কাজ করছে সরকার। বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানো এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পের বিকাশের মাধ্যমে অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
আলোচনায় বাংলাদেশ ও মারুবেনি কর্পোরেশনের দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক সম্পর্কের বিষয়টি উঠে আসে। বিশেষ করে অতীতে পাটজাত পণ্যের বাণিজ্যে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে বাংলাদেশের সহযোগিতার কথা স্মরণ করেন প্রধানমন্ত্রী। এই বিদ্যমান সম্পর্ককে আধুনিক প্রযুক্তি ও নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রগুলোতে সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
বৈঠকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় ছিল তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং সাইবার নিরাপত্তা খাতে বিনিয়োগ ও দক্ষতা উন্নয়ন। স্থানীয় তরুণ প্রকৌশলীদের আন্তর্জাতিক মানের প্রযুক্তিবিদ হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের তরুণদের জন্য উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির সম্ভাবনাও গুরুত্ব পায়।
এ ছাড়া আগামী এক বছরের মধ্যে বাংলাদেশে একটি আধুনিক এআইভিত্তিক ডেটা সেন্টার স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়ে মতবিনিময় হয়। প্রস্তাবিত এই প্রকল্পে মারুবেনি কর্পোরেশনের সম্ভাব্য বিনিয়োগ নিয়েও আলোচনা করা হয়।
ডেটা সেন্টার স্থাপিত হলে দেশের তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো উন্নয়ন, তথ্য সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াকরণ সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং এআইভিত্তিক সেবা সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন, বিনিয়োগের পরিমাণ এবং অংশীদারত্বের কাঠামো সম্পর্কে বৈঠকে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তের তথ্য জানানো হয়নি।
কৃষি খাতে সার সরবরাহ নিশ্চিত করার বিষয়টিও বৈঠকে গুরুত্ব পেয়েছে। কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেডে (কাফকো) মারুবেনির বর্তমান বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি বাংলাদেশে দ্বিতীয় একটি কাফকো কারখানা স্থাপনে অর্থায়নের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়।
জাপানি প্রতিনিধিদল সার উৎপাদন খাতে বিনিয়োগের বিষয়ে গভীর আগ্রহ প্রকাশ করেছে বলে বৈঠক-সংশ্লিষ্ট তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। নতুন কারখানা স্থাপনের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশে সার উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো এবং কৃষি খাতে সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদন সচল রাখতে সময়মতো সার সরবরাহ গুরুত্বপূর্ণ। সে বিবেচনায় সার উৎপাদন ও সরবরাহ অবকাঠামোয় বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়টি দেশের কৃষি অর্থনীতির জন্য তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
বৈঠকে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) নিয়েও আলোচনা হয়। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো আশা প্রকাশ করে, চুক্তিটি কার্যকর হলে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতা আরও বিস্তৃত হবে।
জাপান বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার। দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের পরিধি বাড়াতে প্রযুক্তি, শিল্প উৎপাদন, জ্বালানি ও কৃষিসংশ্লিষ্ট খাতে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ কাজে লাগানোর বিষয়টি আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে।
ইপিএ কার্যকর হলে এর আওতায় বাণিজ্যিক সুবিধা, বাজারে প্রবেশাধিকার এবং বিনিয়োগ সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলো কীভাবে সম্প্রসারিত হবে, তা চুক্তির চূড়ান্ত শর্ত ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে মারুবেনি কর্পোরেশনের প্রতিনিধিদলের এ বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী-২ শামা ওবায়েদ ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ এবং প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী শাকিরুল ইসলাম খান।
মারুবেনি কর্পোরেশনের পক্ষে প্রতিনিধিদলে ছিলেন প্রতিষ্ঠানটির দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়া অঞ্চলের সিইও সুসুমু ওয়াকামোরি এবং বাংলাদেশের কান্ট্রি হেড মানাবু সুগাওয়ারা।
সব মিলিয়ে, মারুবেনি কর্পোরেশনের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর এই বৈঠকে বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক সম্পর্কের একাধিক সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র উঠে এসেছে। প্রযুক্তি, এআই, সাইবার নিরাপত্তা ও সার উৎপাদনে বিনিয়োগ সম্প্রসারণের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, কৃষি খাতের উৎপাদনব্যবস্থা এবং কর্মসংস্থানে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে আলোচিত প্রকল্পগুলোর বাস্তব অগ্রগতি নির্ভর করবে পরবর্তী আলোচনা, বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত ও চুক্তি সম্পাদনের ওপর।












