আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় দেশের জ্বালানি খাতে আর্থিক চাপ সামাল দিতে ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়িয়েছে সরকার। নতুন মূল্য ২১ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হয়েছে।
নতুন দরে প্রতি লিটার ডিজেল ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫ টাকা, পেট্রোল ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৬৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আগে ডিজেল ১১৫, কেরোসিন ১৩৫, পেট্রোল ১৪০ এবং অকটেন ১৪৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছিল।
সরকারের হিসাবে, মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত জ্বালানির দাম না বাড়িয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন বা বিপিসিকে প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা লোকসান বহন করতে হয়েছে। জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি, মধ্যপ্রাচ্যের সংকট, পরিবহন ও বিমা ব্যয় বৃদ্ধি এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের কম দামের কারণে শেষ পর্যন্ত মূল্য সমন্বয় প্রয়োজন হয়ে পড়ে।
জ্বালানি আমদানির ব্যয়ের পরিসংখ্যানেও আন্তর্জাতিক বাজারের চাপের চিত্র উঠে এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ জ্বালানি তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানিতে রেকর্ড ১০ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে। আগের অর্থবছরে এ ব্যয় ছিল ৫ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরে জ্বালানি আমদানি ব্যয় বেড়েছে প্রায় ১০৭ শতাংশ। মোট পণ্য আমদানি ব্যয়ের ১৪ শতাংশেরও বেশি এখন জ্বালানি খাতে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম নয়, পরিশোধিত জ্বালানি পণ্যের দামও বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় বাড়ানোর ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রেখেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পরিশোধিত জ্বালানি পণ্যের গড় আন্তর্জাতিক মূল্য আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একই সময়ে দেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি চাহিদাও বৃদ্ধি পেয়েছে।
সরকারের আরেকটি যুক্তি হলো সীমান্তপথে জ্বালানি পাচার। প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে জ্বালানির দাম কম থাকায় বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে আমদানি করা জ্বালানি অন্য দেশে পাচারের ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল। তাঁর দেওয়া হিসাবে কলকাতায় প্রতি লিটার ডিজেলের দাম প্রায় ১৩৪ টাকা ৭৬ পয়সা, মিয়ানমারে ১৬৪ টাকা ৮৩ পয়সা, নেপালে ১৬১ টাকা ২৪ পয়সা এবং শ্রীলঙ্কায় ১৭৯ টাকা ৪২ পয়সা।
প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারের দামের সঙ্গে পুরোপুরি সমন্বয় করা হলে দেশে ডিজেলের দাম আরও বেশি হতে পারত। তবে সাধারণ ভোক্তা, গণপরিবহন ও কৃষির ওপর চাপ বিবেচনায় সরকার নতুন দাম তুলনামূলক কম পর্যায়ে রেখেছে এবং ভর্তুকির অংশও বহাল থাকছে।
এদিকে জ্বালানির দাম সমন্বয়ের ফলে বিপিসির আর্থিক ক্ষতি কমানোর সুযোগ তৈরি হলেও এর প্রভাব পরিবহন, শিল্প উৎপাদন ও পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় পড়তে পারে। অর্থনীতিবিদ সেলিম রায়হান সতর্ক করে বলেছেন, জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বাড়ার মাধ্যমে মূল্যস্ফীতিতে নতুন চাপ তৈরি হতে পারে।
ব্যবসায়ী মহল থেকেও বাড়তি ব্যয়ের আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। বাংলাদেশ-থাই চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি শামস মাহমুদ বলেছেন, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি উৎপাদন, লজিস্টিকস, কৃষি ও সেবা খাতের ব্যয় বাড়াবে এবং রপ্তানিমুখী শিল্পের ওপরও চাপ তৈরি করতে পারে।
জ্বালানি আমদানির অর্থায়নেও সরকার বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে জ্বালানি তেল, এলএনজি ও সার আমদানির অর্থায়নে ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ট্রেড ফাইন্যান্স করপোরেশন বা আইআইটিএফসি থেকে ২ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির বাড়তি ব্যয়, বিপিসির বড় অঙ্কের লোকসান, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ এবং সীমান্তপথে পাচারের ঝুঁকি—এই কয়েকটি বিষয়কে সামনে রেখে সরকার মূল্য সমন্বয় করেছে। একই সঙ্গে আমদানির অর্থায়ন নিশ্চিত করতে বৈদেশিক ঋণ ও অন্যান্য আর্থিক ব্যবস্থার ওপরও জোর দেওয়া হচ্ছে।
তবে মূল্যবৃদ্ধির কারণে সাধারণ মানুষের ব্যয় এবং অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে কী ধরনের প্রভাব পড়ে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। সরকার বাজার ও পরিবহন খাতে অতিরিক্ত মূল্য আদায় ঠেকাতে নজরদারি জোরদারের কথা জানিয়েছে।












