সালমান শাহ হত্যা মামলায় তার স্ত্রী সামীরা হকসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে করা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আগামী ৫ নভেম্বর দিন ধার্য করেছেন আদালত। নির্ধারিত দিনে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল না হওয়ায় মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানার আদালত নতুন এ তারিখ নির্ধারণ করেন।
রমনা থানার আদালতের সাধারণ নিবন্ধন শাখার কর্মকর্তা পুলিশের উপপরিদর্শক শাহ আলম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
মামলাটি প্রখ্যাত চিত্রনায়ক সালমান শাহ, যার পুরো নাম চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন, এর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে দায়ের করা হয়েছে। মামলায় সালমান শাহকে পূর্বপরিকল্পিতভাবে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে এ অভিযোগ এখনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি এবং মামলার তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া চলমান।
গত বছরের ২১ অক্টোবর সালমান শাহের মামা মোহাম্মদ আলমগীর রাজধানীর রমনা থানায় মামলাটি করেন। দণ্ডবিধির ৩০২ ও ৩৪ ধারায় দায়ের করা মামলায় ১১ জনকে আসামি করা হয়। একই সঙ্গে মামলায় আরও কয়েকজন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে।
মামলার এজাহারে সালমান শাহের স্ত্রী সামীরা হক, শিল্পপতি ও সাবেক চলচ্চিত্র প্রযোজক আজিজ মোহাম্মদ ভাই, লতিফা হক লুছি, খলনায়ক ডন, ডেবিট, জাভেদ, ফারুক, মে-ফেয়ার বিউটি সেন্টারের রুবি, আব্দুস ছাত্তার, সাজু এবং রেজভি আহমেদ ফরহাদকে আসামি করা হয়েছে।
১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর ইস্কাটনের বাসায় সালমান শাহের মৃত্যু হয়। তার মৃত্যুর পর রমনা থানায় প্রথমে একটি অপমৃত্যু মামলা করা হয়েছিল। দীর্ঘ সময় ধরে তার মৃত্যুর কারণ নিয়ে নানা আলোচনা ও আইনি প্রক্রিয়া চলতে থাকে।
এরই ধারাবাহিকতায় গত ২০ অক্টোবর ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মো. জান্নাতুল ফেরদৌস ইবনে হক বাদীপক্ষের করা রিভিশন মঞ্জুর করেন। আদালত আগের অপমৃত্যু মামলাটি হত্যা মামলা হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দেন। পরদিন, ২১ অক্টোবর, সালমান শাহের মামা মোহাম্মদ আলমগীর রমনা থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন।
মামলার এজাহারে বাদী সালমান শাহের মৃত্যুর দিনের ঘটনাবলির বর্ণনা দিয়েছেন। এজাহার অনুযায়ী, ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সালমান শাহের মা নিলুফার জামান চৌধুরী (নীলা চৌধুরী), বাবা কমর উদ্দীন আহমদ চৌধুরী এবং পরিবারের সদস্যরা ইস্কাটনের বাসায় সালমানের সঙ্গে দেখা করতে যান। সেখানে গিয়ে তারা জানতে পারেন, সালমান ঘুমাচ্ছেন।
কিছুক্ষণ পর প্রডাকশন ম্যানেজার সেলিম ফোন করে সালমানের অসুস্থতার কথা জানান বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর পরিবারের সদস্যরা দ্রুত বাসায় ফিরে তাকে শয়নকক্ষে নিথর অবস্থায় দেখতে পান।
বাদীর অভিযোগ অনুযায়ী, সেখানে কয়েকজন নারী সালমানের হাত-পায়ে তেল মালিশ করছিলেন এবং পাশের কক্ষে সামীরার আত্মীয় রুবি অবস্থান করছিলেন। সালমানের মা তাকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন।
এজাহারে আরও দাবি করা হয়, হাসপাতালে নেওয়ার পথে পরিবারের সদস্যরা সালমানের গলায় দড়ির দাগ এবং মুখমণ্ডল ও পায়ে নীলচে দাগ দেখতে পান। প্রথমে তাকে হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন বলে মামলার অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
সালমান শাহের মৃত্যুর পর থেকেই তার পরিবার মৃত্যুর কারণ নিয়ে প্রশ্ন তোলে। মামলার বাদী মোহাম্মদ আলমগীরের এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, সালমানের বাবা কমর উদ্দীন আহমদ চৌধুরীও ছেলের মৃত্যুকে হত্যাকাণ্ড হিসেবে সন্দেহ করেছিলেন।
এজাহার অনুযায়ী, ১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই তিনি ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আবেদন করে রমনা থানার অপমৃত্যু মামলাটি দণ্ডবিধির ৩০২/৩৪ ধারায় হত্যা মামলা হিসেবে গ্রহণ এবং সিআইডির মাধ্যমে তদন্তের আবেদন করেছিলেন।
সালমান শাহের বাবার মৃত্যুর পর তার বোন নীলা চৌধুরীর পক্ষ থেকে মোহাম্মদ আলমগীর মামলাটি পরিচালনা করছেন বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, এজাহারভুক্ত ও অজ্ঞাতনামা পলাতক আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে পূর্বপরিকল্পিতভাবে সালমান শাহকে হত্যা করেছেন। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা এখনো আদালতের বিচারে প্রমাণিত হয়নি। তদন্তে সংগৃহীত তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে মামলার প্রকৃত ঘটনা ও দায় নির্ধারণের বিষয়টি এখন তদন্তাধীন।
মামলায় অভিযুক্তদের মধ্যে কেউ মারা গিয়ে থাকলে, তা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে মামলার দায় থেকে অব্যাহতি দেওয়ার বিষয়টিও আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে মঙ্গলবার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আদালতে নির্ধারিত দিন থাকলেও তদন্তকারী কর্মকর্তা প্রতিবেদন জমা দেননি। ফলে আদালত আগামী ৫ নভেম্বর প্রতিবেদন দাখিলের নতুন তারিখ নির্ধারণ করেন।
এখন নির্ধারিত দিনে তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা পড়ার পর মামলার তদন্তে কী তথ্য ও প্রমাণ উঠে এসেছে এবং আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে তদন্তকারী কর্মকর্তার অবস্থান কী—তা স্পষ্ট হবে। এরপর আদালতের পরবর্তী নির্দেশনা অনুযায়ী মামলার বিচারিক কার্যক্রম এগিয়ে যাবে।












