ইরান যুদ্ধ শুরুর পর গত সেপ্টেম্বর মাসে কৌশলগত আন্তর্জাতিক নৌপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবহন বিগত ছয় মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী আন্তর্জাতিক সংস্থা কেপলার এবং বার্তা সংস্থা রয়টার্সের সংগৃহীত তথ্যের বরাতে জ্বালানিবিষয়ক ওয়েবসাইট ‘অয়েল প্রাইস ডট অর্গ’ জানিয়েছে, সেপ্টেম্বর মাসে মোট ২১টি এলএনজিবাহী কার্গো জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে পেরেছে। যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে একক কোনো মাসে এটি সর্বোচ্চ সংখ্যা হলেও যুদ্ধপূর্ব স্বাভাবিক পরিস্থিতির তুলনায় তা এখনো অনেক কম। কারণ সংঘাত শুরুর আগে বিশ্বের মোট এলএনজি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই নৌপথ দিয়ে পরিবাহিত হতো এবং তখন নিয়মিতভাবে প্রতিদিন গড়ে প্রায় তিনটি করে এলএনজি কার্গো হরমুজ প্রণালি পার হতো; যেখানে জাহাজ চলাচল সংক্রান্ত উপাত্ত অনুযায়ী চলতি সপ্তাহে কাতারের প্রধান রপ্তানি কেন্দ্র রাস লাফান থেকে মাত্র তিনটি কার্গোকে প্রণালির বাইরে চলাচল করতে দেখা গেছে।
বর্তমানে নিরাপত্তার কারণে বেশির ভাগ এলএনজি পরিবহনকারী জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের সময় তাদের স্বয়ংক্রিয় অবস্থান শনাক্তকরণ ব্যবস্থা বা এআইএস বন্ধ রাখছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের পক্ষে জাহাজগুলোর সুনির্দিষ্ট গতিবিধি অনুসরণ করা এবং বিশ্ববাজারে এলএনজির প্রকৃত সরবরাহ ও ভারসাম্যের সঠিক হিসাব নিরূপণ করা অত্যন্ত জটিল হয়ে পড়েছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের কিছু এলএনজি কার্গো হরমুজ পার হতে সক্ষম হলেও বৈশ্বিক সরবরাহ সংকটের তুলনায় তা নিতান্তই অপ্রতুল। এ ছাড়া হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন লাখ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পরিবহন করা সম্ভব হলেও এলএনজির ক্ষেত্রে তা অনেক কঠিন; কারণ সাধারণ তেলবাহী ট্যাঙ্কার থেকে অন্য জাহাজে তেল স্থানান্তর করা তুলনামূলক সহজ হলেও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে এক জাহাজ থেকে অন্য জাহাজে এলএনজি স্থানান্তর করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও জটিল।
গত ছয় মাস ধরে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহ ব্যাপকভাবে সংকুচিত হয়ে পড়ায় এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে এশিয়া ও ইউরোপের জ্বালানি বাজারে। সেপ্টেম্বর মাসে এই দুই অঞ্চলের বাজারে গ্যাসের দাম বেড়ে ২০২২-২৩ সালের বৈশ্বিক জ্বালানিসংকটের পর আবারও সর্বোচ্চ পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে। বিশ্ববাজারের যে অংশটুকু হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরশীল নয়, সেই সীমিত সরবরাহের বিকল্প এলএনজি সংগ্রহের জন্য আমদানিকারক দেশগুলোর মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা তৈরি হওয়ায় দাম লাফিয়ে বাড়ছে। এই অব্যাহত পরিবহন জটিলতার কারণে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ‘কাতারএনার্জি’ জানিয়েছে যে, তারা আগামী নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ ও পাকিস্তানসহ এশিয়ার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রাহক দেশে চুক্তিবদ্ধ এলএনজি সরবরাহ করতে পারবে না, যা সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় নতুন উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
কৌশলগত হরমুজ প্রণালি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সামরিক ও রাজনৈতিক অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হওয়ায় আন্তর্জাতিক এই জলপথে এলএনজি পরিবহন কবে নাগাদ পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে, তা এখনো সম্পূর্ণ অনিশ্চিত। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্য থেকে এলএনজির সরবরাহপ্রবাহ যদি দ্রুত স্বাভাবিক না হয়, তবে আসন্ন শীত মৌসুমে ইউরোপ ও এশিয়ার দেশগুলোতে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ও গৃহস্থালি উষ্ণ রাখার ক্ষেত্রে মারাত্মক সংকট তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে চলতি বছর শীতের তীব্রতা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হলে বৈশ্বিক এই গ্যাস সংকট আরও ভয়ংকর রূপ ধারণ করতে পারে।












