টানা ভারী বৃষ্টিতে ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়েছে থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংকক। মাত্র দুই দিনে শহরের কিছু এলাকায় প্রায় ৩০০ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাত হওয়ায় বহু এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। পরিস্থিতি এতটাই নাজুক হয়েছে যে ব্যাংককের ৫০টি জেলার সবকটিতেই বন্যা দুর্যোগ ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। সরকারি হিসাবে বন্যাজনিত বিভিন্ন ঘটনায় প্রায় ৪০ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাঁদের মধ্যে কেউ পানিতে ডুবে এবং কয়েকজন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা গেছেন।
দুর্যোগের কারণে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার সড়ক পানির নিচে চলে গেছে। কোথাও কোথাও পানি এতটাই বেড়েছে যে রাস্তাঘাট স্থির পানির বিশাল জলাশয়ের মতো দেখাচ্ছে। হাজারো মানুষকে শহরের ২৩০টির বেশি আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। কয়েকটি এলাকায় ঘরের নিচতলা ও পার্ক করে রাখা গাড়ি পানিতে ডুবে গেছে।
ব্যাংককের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের খলং চান আবাসিক এলাকাসহ বেশ কয়েকটি এলাকা বন্যার ভয়াবহতার প্রতীক হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন ছবিতে দেখা গেছে, বাদামি পানির মধ্যে ভবনগুলো দাঁড়িয়ে আছে এবং অনেক গাড়ির শুধু ছাদ দেখা যাচ্ছে। কয়েক দফা বৃষ্টির পর কিছু এলাকায় পানি কমতে শুরু করলেও শহরের বেশ কিছু অংশে এখনো জলাবদ্ধতা ও দুর্ভোগ রয়ে গেছে।
চাও ফ্রায়া নদীর বন্যাপ্রবণ সমভূমির ওপর গড়ে ওঠা ব্যাংকক শহর পানি নিষ্কাশনের জন্য খাল, পাম্প ও বাঁধের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু দ্রুত নগরায়ণ ও কংক্রিটের অবকাঠামো নির্মাণের ফলে শহরের অনেক খাল সংকুচিত বা বিলীন হয়েছে। ফলে অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা কমেছে।
বন্যার কারণে শহরের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। ব্যাংককের প্রধান সুবর্ণভূমি বিমানবন্দরে একপর্যায়ে থাই এয়ারওয়েজের প্রায় অর্ধেক কর্মী কাজে পৌঁছাতে না পারায় বিপুলসংখ্যক লাগেজ জমে যায় এবং কয়েকটি ফ্লাইট বাতিল করতে হয়। অনেক স্কুল বন্ধ রয়েছে। বিভিন্ন সড়কে তীব্র যানজট তৈরি হওয়ায় তুলনামূলক কম ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মানুষও চলাচলে সমস্যায় পড়েছেন।
পরিস্থিতি সামাল দিতে থাই সরকার জরুরি তৎপরতা জোরদার করেছে। প্রধানমন্ত্রী আনুতিন চার্নভিরাকুল জানিয়েছেন, উত্তরের দিক থেকে আসা বন্যার পানির কারণে ব্যাংককের মহানগর এলাকা এখনো ঝুঁকিতে রয়েছে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য একটি জরুরি নিয়ন্ত্রণকক্ষ বা ‘ওয়ার রুম’ও চালু করা হয়েছে।
তবে ভারী বৃষ্টির ঝুঁকি এখনো কাটেনি। থাই আবহাওয়া অধিদপ্তর ৪ থেকে ৭ অক্টোবর পর্যন্ত দেশটির উচ্চভূমি ও বিভিন্ন অঞ্চলে বজ্রসহ বৃষ্টি, দমকা হাওয়া এবং কোথাও কোথাও ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছে। ৫ ও ৬ অক্টোবর মধ্যাঞ্চল, ব্যাংকক ও আশপাশের এলাকায়ও ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। এর ফলে নিচু এলাকায় নতুন করে আকস্মিক বন্যা ও জলাবদ্ধতার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যাংককের বর্তমান দুর্যোগ শুধু অতিবৃষ্টির ফল নয়; শহরের ভৌগোলিক অবস্থান ও অপর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশনব্যবস্থাও পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। পরামর্শক ও গবেষক নাইম লায়েনির মতে, ব্যাংককের অধিকাংশ নিষ্কাশন খাল সাধারণত ঘণ্টায় প্রায় ৬০ মিলিমিটার বৃষ্টির পানি সামাল দিতে পারে। উন্নত কিছু এলাকায় এই সক্ষমতা ৮০ মিলিমিটার পর্যন্ত হলেও কয়েকটি এলাকায় এর চেয়েও বেশি বৃষ্টি হয়েছে এবং পরপর বৃষ্টির কারণে পানি নামার পর্যাপ্ত সময় পাওয়া যায়নি।
বিজ্ঞানীদের মতে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় চরম বৃষ্টিপাত ও বন্যার প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে বাড়ছে। উষ্ণ সমুদ্র থেকে বেশি জলীয়বাষ্প বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করলে উষ্ণ বাতাস তা আরও বেশি ধারণ করতে পারে, ফলে অল্প সময়ে অতিভারী বৃষ্টিপাতের ঝুঁকি বাড়ে। তবে সাম্প্রতিক এই নির্দিষ্ট বৃষ্টিপাতকে সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনের ফল হিসেবে চিহ্নিত করতে আরও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ প্রয়োজন বলে বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেছেন।
বন্যার পাশাপাশি প্রতিবেশী মিয়ানমারেও একই আবহাওয়া ব্যবস্থার প্রভাবে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনা ঘটেছে। ফলে থাইল্যান্ডসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে আবহাওয়া পরিস্থিতি নিয়ে সতর্কতা অব্যাহত রয়েছে।
ব্যাংককের পরিস্থিতি কিছু এলাকায় সাময়িকভাবে উন্নত হলেও সম্পূর্ণ পানি নামতে আরও কয়েক দিন সময় লাগতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। নতুন করে ভারী বৃষ্টি হলে পরিস্থিতি আবারও অবনতির আশঙ্কা রয়েছে। তাই স্থানীয় বাসিন্দাদের সতর্ক থাকতে এবং সরকারি নির্দেশনা অনুসরণ করতে বলা হয়েছে।












