হরমুজ প্রণালী নিয়ে ইরান ও উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে নির্ধারিত কূটনৈতিক বৈঠক স্থগিত হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা আরও গভীর হয়েছে। এর সঙ্গে সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ তেল পাইপলাইনে হামলা এবং হরমুজে জাহাজ চলাচল কমে যাওয়ায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারেও। সর্বশেষ বাজারদরে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ৩ শতাংশের মতো বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৭ ডলারের ওপরে উঠেছে।
ওমানের মধ্যস্থতায় ইরান ও উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে সোমবার বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। তবে ঐকমত্য তৈরির স্বার্থে বৈঠকটি স্থগিত করা হয়েছে বলে ওমান জানিয়েছে। কিছু আঞ্চলিক দেশের অনুরোধের পর তেহরান ও মাসকাট যৌথভাবে বৈঠক পিছিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। নতুন তারিখ পরে নির্ধারণ করা হবে বলে জানা গেছে।
বৈঠক স্থগিত হওয়ার ঘটনা এমন সময়ে ঘটল, যখন হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহান্তে মাত্র চারটি পণ্যবাহী জাহাজ উপসাগর থেকে বের হয়েছে এবং ১০টি জাহাজ প্রবেশ করেছে। যুদ্ধের আগে এই প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১২৫টি জাহাজ চলাচল করত এবং বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল ও এলএনজি সরবরাহ এই পথের ওপর নির্ভরশীল ছিল।
এরই মধ্যে সৌদি আরবের ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইন সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ইরাক থেকে আসা ড্রোন হামলায় পাইপলাইনের কয়েকটি স্থানে ক্ষয়ক্ষতির পর সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে এটি বন্ধ করা হয়। পাইপলাইনটি সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চল থেকে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে তেল পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প পথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল, যার মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ৪০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহনের সক্ষমতা রয়েছে।
এই পাইপলাইন হরমুজ প্রণালী এড়িয়ে সৌদি তেল রপ্তানির একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প ব্যবস্থা। এটি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে বৈশ্বিক তেল সরবরাহের প্রায় ৪ শতাংশ পর্যন্ত ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে বাজার বিশ্লেষণে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ইয়ানবু বন্দরে থাকা মজুত দিয়ে সৌদি আরব মাত্র পাঁচ থেকে সাত দিন পর্যন্ত রপ্তানি চালিয়ে যেতে পারবে বলেও রয়টার্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
হরমুজের পাশাপাশি লোহিত সাগরের প্রবেশপথ বাব আল-মানদাব নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ইয়েমেনের হুথি বাহিনীর কৌশলগত পেরিম দ্বীপ নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার ঘটনা এবং সৌদি ভূখণ্ডে হামলার কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের নিরাপত্তা নিয়েও নতুন করে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের দুটি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ একই সময়ে ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।
এদিকে ইরান হরমুজ প্রণালী নিয়ে নিজেদের অবস্থান কঠোর রেখেছে। তেহরানের পক্ষ থেকে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, আঞ্চলিক কোনো সমঝোতা হলেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোর সমাধান না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ দিয়ে স্বাভাবিক নৌ চলাচল পুরোপুরি ফিরবে না। এর ফলে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
সৌদি পাইপলাইনে হামলার দায় নিয়ে এখনো কোনো পক্ষের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি নেই। সৌদি ও ইরাকি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ড্রোনগুলো ইরাকের ভূখণ্ড থেকে উৎক্ষেপিত হয়েছিল এবং এ ঘটনায় তদন্ত চলছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে সম্ভাব্যভাবে দায়ী করলেও ইরান-সমর্থিত কয়েকটি গোষ্ঠী হামলার দায় অস্বীকার করেছে। ফলে হামলার সরাসরি দায় কার, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
জ্বালানি সরবরাহের উদ্বেগের প্রভাব ইতোমধ্যে বাজারে স্পষ্ট হয়েছে। ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ১০৭ ডলারের ওপরে এবং যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেলের দাম ১০২ ডলারের ওপরে উঠেছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দামও রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে বলে আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে হরমুজ প্রণালী নিয়ে কূটনৈতিক আলোচনা স্থগিত, সৌদি তেল পাইপলাইনে হামলা এবং বাব আল-মানদাব অঞ্চলে নতুন করে নিরাপত্তা ঝুঁকি—এই তিনটি ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে। কূটনৈতিক উদ্যোগ দ্রুত পুনরায় শুরু না হলে এবং গুরুত্বপূর্ণ নৌ ও স্থলপথে জ্বালানি পরিবহন স্বাভাবিক না হলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ও পরিবহন ব্যয় আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।












