যানজটে স্থবির রাজধানীতে গণপরিবহনে গতি আনতে আরও বিস্তৃত হচ্ছে মেট্রোরেল নেটওয়ার্ক। রাজধানীর পশ্চিমের গাবতলী থেকে পূর্বের দাশেরকান্দি পর্যন্ত প্রায় ১৭ দশমিক ২ কিলোমিটার দীর্ঘ নতুন মেট্রোরেল করিডোর নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ‘এমআরটি লাইন-৫ (সাউদার্ন রুট)’ নামে প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৫ হাজার ৫০৩ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। প্রকল্পটি এখন জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, আগামী ১৬ সেপ্টেম্বর একনেকের সভায় প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য উপস্থাপনের কথা রয়েছে। অনুমোদন পেলে এটি হবে বর্তমান সরকারের সময়ে নতুন করে এগিয়ে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ মেট্রোরেল প্রকল্পগুলোর একটি। বাস্তবায়নের সময় ধরা হয়েছে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০৩৩ সালের আগস্ট পর্যন্ত। প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল)।
প্রস্তাবিত রুটটি গাবতলী থেকে টেকনিক্যাল, কল্যাণপুর, শ্যামলী, কলেজ গেট, আসাদ গেট, শুক্রাবাদ, কারওয়ান বাজার, হাতিরঝিল ও তেজগাঁও হয়ে আফতাবনগর দিয়ে দাশেরকান্দি পর্যন্ত যাবে। প্রকল্পের বড় একটি অংশ হবে ভূগর্ভস্থ। গাবতলী থেকে আফতাবনগর পর্যন্ত অংশের বড় অংশ টানেলের মাধ্যমে নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। আর আফতাবনগর থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত অংশ হবে উড়ালপথে।
এই মেট্রোরেলের সবচেয়ে বড় গুরুত্ব শুধু নতুন একটি রুট তৈরিতে নয়, বরং ঢাকার বিভিন্ন মেট্রো করিডোরের মধ্যে সংযোগ তৈরিতে। এমআরটি লাইন-৫-এর সাউদার্ন রুট ভবিষ্যতে লাইন-৫-এর নর্দার্ন রুট এবং এমআরটি লাইন-১-এর সঙ্গে আন্তঃসংযোগ তৈরি করবে। ফলে যাত্রীরা এক করিডোর থেকে অন্য করিডোরে তুলনামূলক সহজে যাতায়াতের সুযোগ পাবেন।
প্রকল্পের মোট ব্যয়ের মধ্যে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন থাকবে ১৫ হাজার ১৯৭ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) এবং দক্ষিণ কোরিয়ার ইডিসিএফ থেকে প্রকল্প ঋণ হিসেবে আসবে প্রায় ৩০ হাজার ৩০৬ কোটি ১০ লাখ টাকা।
প্রকল্পের ব্যয় শুরুতে আরও বেশি ছিল। প্রাথমিক প্রস্তাবে ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫৪ হাজার ৬১৮ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। বিভিন্ন পর্যালোচনার পর ভূমি, প্রশাসনিক ব্যয় ও সুদসংক্রান্ত হিসাবসহ কয়েকটি খাতে পরিবর্তন এনে সর্বশেষ ব্যয় কমিয়ে ৪৫ হাজার ৫০৩ কোটি ৭৭ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
ব্যয়ের বড় অংশ যাবে মূল লাইন ও স্টেশন নির্মাণ এবং ডিপোর সিভিল ও ভবন নির্মাণে। এর পাশাপাশি বৈদ্যুতিক, যান্ত্রিক ও রেলওয়ে ব্যবস্থাপনা, রোলিং স্টক ও ডিপো সরঞ্জাম এবং ভূমি অধিগ্রহণ ও পুনর্বাসনেও বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে।
রাজধানীর ঘনবসতিপূর্ণ পশ্চিম, মধ্য ও পূর্বাঞ্চলের মধ্যে দ্রুত যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করাই এই প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য। বর্তমানে এসব এলাকার যাতায়াত অনেকটাই সড়কনির্ভর। ফলে নতুন মেট্রোরেল চালু হলে সড়কের ওপর গণপরিবহনের চাপ কমার পাশাপাশি যাতায়াতের সময়ও কমতে পারে।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের প্রকল্প-তথ্য অনুযায়ী, গাবতলী-দাশেরকান্দি করিডোরের মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ১৭ দশমিক ৪ কিলোমিটার হিসেবে পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১২ দশমিক ৮ কিলোমিটার হবে ভূগর্ভস্থ এবং বাকি অংশ উড়ালপথে নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, নতুন এই মেট্রোরেল চালু হলে রাজধানীর পূর্ব-পশ্চিম যোগাযোগ আরও শক্তিশালী হবে। পাশাপাশি বিদ্যমান সড়ক ব্যবস্থার ওপর চাপ কমিয়ে পরিবেশবান্ধব গণপরিবহনের পরিধি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
তবে প্রকল্পটির সফলতা নির্ভর করবে সময়মতো নির্মাণকাজ শেষ করা, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, ভূমি অধিগ্রহণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা এবং নির্মাণকাজের সময় রাজধানীর স্বাভাবিক যান চলাচল যতটা সম্ভব সচল রাখার ওপর।
একনেকে অনুমোদনের পরই প্রকল্পটির বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে আরও এগিয়ে যাবে। নির্ধারিত সময় অনুযায়ী কাজ শেষ করা সম্ভব হলে গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত এই মেট্রোরেল রাজধানীর পশ্চিম ও পূর্ব অংশের মধ্যে দ্রুত, নির্ভরযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব যোগাযোগের নতুন দ্বার খুলে দিতে পারে।












