রাজধানী ঢাকায় কয়েক দিন ধরে বিভিন্ন স্থানে ককটেল বিস্ফোরণ ও যানবাহনে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় জনমনে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ১৮ থেকে ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় একাধিক বিস্ফোরণ ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার পর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, প্রবেশপথ, উড়ালসড়ক ও কেপিআই এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত মালিবাগ, মহাখালী, যাত্রাবাড়ী, আগারগাঁওসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ককটেল বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যায়। মালিবাগ রেলগেটসংলগ্ন সড়কে দুটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটে। পরে মহাখালী ও যাত্রাবাড়ীতেও বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। যাত্রাবাড়ী থানার সামনে ও আশপাশে একাধিক বিস্ফোরণে একজন অটোরিকশাচালক আহত হন।
এদিন কাফরুল থানার সামনে একটি ফাঁকা বাসে আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটে। একই রাতে রামপুরার বিটিভি ভবনের সামনে বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যায়। আগারগাঁওয়ের বাংলাদেশ বেতার ভবনের সামনেও বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনার কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিস্ফোরণের ধরন ও কারণ তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করতে পারেনি পুলিশ।
পরদিন শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, কমলাপুর, পল্টন ও শাহবাগসহ কয়েকটি এলাকায় আরও ককটেল বা হাতবোমা বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যায়। এর মধ্যে যাত্রাবাড়ী এলাকায় বিস্ফোরণে একজন অটোরিকশাচালক আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। কমলাপুর রেলস্টেশনেও হাতবোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
একই সময়ে রাজধানীর কয়েকটি এলাকায় বাস ও অন্যান্য যানবাহনে আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটে। তবে কোনো কোনো ঘটনায় আগুনের কারণ তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ফলে অগ্নিসংযোগের প্রতিটি ঘটনাকে একই ধরনের নাশকতা হিসেবে চিহ্নিত করার আগে তদন্তের ফলাফলের অপেক্ষা করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি স্থানের কাছেও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। হাইকোর্টের সামনের সড়ক ও মৎস্য ভবন মোড় এলাকায় বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যায়। এসব ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি এবং সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে জড়িতদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
যাত্রাবাড়ীর ঘটনায় চারজন গ্রেপ্তার
যাত্রাবাড়ী থানার সামনে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন মো. রায়হান উদ্দিন, রাসেল খান, আলা উদ্দিন ও আব্দুল্লাহ। ডিবির দাবি, তাদের মধ্যে রায়হান উদ্দিন কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের একজন নেতা। তার কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে লালবাগের একটি ভবনের পার্কিং এলাকা থেকে চারটি অবিস্ফোরিত ককটেল উদ্ধারের কথাও জানিয়েছে পুলিশ।
ডিবির ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনার মোল্লা মো. শাহীন জানিয়েছেন, ঘটনাগুলোর পেছনে কারা রয়েছে এবং কেন এসব বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে, তা জানতে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ড চাওয়া হবে। পুলিশের পক্ষ থেকে এসব ঘটনায় রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ও নিষিদ্ধ সংগঠনের নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগও করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগ এখনো তদন্তাধীন এবং রাজধানীর সব বিস্ফোরণ ও অগ্নিসংযোগ একই ব্যক্তি বা নেটওয়ার্কের মাধ্যমে হয়েছে—এমন কোনো চূড়ান্ত প্রমাণ এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।
৫৫ মামলায় ৫২৭ গ্রেপ্তার
এদিকে রাজধানীতে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) নিয়মিত অভিযানে ২৪ ঘণ্টায় ৫২৭ জনকে গ্রেপ্তার এবং ৫৫টি মামলা করার তথ্য জানিয়েছে পুলিশ। অভিযানে একটি অবিস্ফোরিত ককটেল, ৫০০ গ্রাম গানপাউডার, ২৫০ মিলিলিটার পেট্রোল, বিস্ফোরিত ককটেলের বিভিন্ন আলামত, পেরেক, টেপসহ বিভিন্ন সামগ্রী উদ্ধারের কথা জানিয়েছে ডিএমপি।
ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তারদের মধ্যে মিরপুর বিভাগে ১৪৬ জন, তেজগাঁওয়ে ৭৯, মতিঝিলে ৬৩, ওয়ারীতে ৫৭, রমনায় ৫২, উত্তরা ৪৫, লালবাগ ৪৩ এবং গুলশানে ৪১ জন রয়েছেন। গোয়েন্দা বিভাগও একজনকে গ্রেপ্তার করেছে।
নিরাপত্তা জোরদার
ধারাবাহিক বিস্ফোরণ ও অগ্নিসংযোগের পর রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট, প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ এবং কেপিআই এলাকায় তল্লাশি ও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। সন্দেহজনক ব্যক্তি ও যানবাহনে তল্লাশির পাশাপাশি মোবাইল টিম, মোটরসাইকেল পেট্রোলিং এবং গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
পাশাপাশি বাস ও গণপরিবহনের নিরাপত্তা নিয়েও পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের সতর্ক করেছে পুলিশ। সন্দেহজনক যাত্রী, ব্যাগ বা কোনো বিস্ফোরকসদৃশ বস্তু দেখা গেলে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানোর আহ্বান জানানো হয়েছে। চলন্ত ও পার্ক করা বাসের নিরাপত্তায় চালক-হেলপারদের সতর্ক থাকার পাশাপাশি বাসে ফায়ার এক্সটিংগুইশার রাখার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তবে পৃথক পৃথক বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ এবং এসব ঘটনার মধ্যে কোনো সমন্বিত যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হবে।












