ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভের দিনিপ্রো নদীর ওপর থাকা দুটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুতে রুশ বিমান হামলার পর শহরের পূর্ব ও পশ্চিম অংশের যোগাযোগব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। শনিবার (৩ অক্টোবর) উত্তরাঞ্চলীয় সেতুতে নতুন করে হামলা হয়। এর আগে দক্ষিণাঞ্চলীয় সেতুতেও একাধিক হামলা চালানো হয়েছিল। কিয়েভের মেয়র ভিতালি ক্লিৎস্কোর ভাষ্য, ধারাবাহিক এসব হামলা রাজধানীর স্বাভাবিক যোগাযোগব্যবস্থায় বড় চাপ তৈরি করেছে।
শনিবারের হামলায় দিনিপ্রো নদীর ওপর থাকা নর্দার্ন বা পিভনিচনি সেতুর সড়কের অংশ এবং ট্রলিবাসের বিদ্যুৎ সংযোগ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হামলার পর সেতুটিতে যান চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং জরুরি সেবা ও উদ্ধারকর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছান। রয়টার্সের প্রাথমিক প্রতিবেদনে হতাহতের কথা পাওয়া না গেলেও পরে বিভিন্ন ইউক্রেনীয় সূত্রে আহতের খবর এসেছে।
এর আগে বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার কিয়েভের দক্ষিণাঞ্চলীয় বা পিভদেনি সেতুতে একাধিক হামলা হয়। এসব হামলার কারণে ওই সেতুর পাশাপাশি দিনিপ্রোর ওপর থাকা আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুতেও যান চলাচল সাময়িকভাবে সীমিত বা বন্ধ করা হয়। ফলে নদীর দুই পাড়ের মধ্যে যান চলাচলে দীর্ঘ যানজট ও ব্যাপক ভোগান্তি তৈরি হয়।
কিয়েভের দুই পাড়ের যোগাযোগের জন্য এসব সেতু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শহরের ৩০ লাখের বেশি মানুষের একটি বড় অংশ দিনিপ্রোর পূর্ব তীরে বসবাস করলেও কর্মসংস্থানের জন্য তাঁদের অনেকেই পশ্চিম তীরে যাতায়াত করেন। ফলে সেতুগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা শুধু সামরিক পরিবহন নয়, সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও বড় প্রভাব ফেলে।
ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষ মনে করছে, সেতুগুলোতে ধারাবাহিক হামলার মাধ্যমে রাশিয়া কিয়েভের পরিবহনব্যবস্থা ও সামগ্রিক অবকাঠামোর ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিও অভিযোগ করেছেন, রাশিয়া যুদ্ধের কৌশল হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক অবকাঠামোতে হামলা বাড়াচ্ছে এবং শীত শুরুর আগে দেশটির বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থাকে দুর্বল করার চেষ্টা করছে। তবে এসব অভিযোগ রাশিয়া অস্বীকার করে আসছে।
অন্যদিকে, রুশ প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, সেতুগুলো ইউক্রেনীয় সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম পরিবহনে ব্যবহৃত হওয়ায় সেগুলোকে সামরিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। মস্কো বেসামরিক মানুষকে ইচ্ছাকৃতভাবে লক্ষ্য করার অভিযোগ অস্বীকার করেছে এবং তাদের হামলাকে সামরিক অবকাঠামোর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করছে।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে কিয়েভে রাশিয়ার বিমান হামলার ধরনও বদলেছে। রাশিয়া জেটচালিত ড্রোনসহ নতুন ধরনের আকাশযান ব্যবহার করছে বলে ইউক্রেন জানিয়েছে। ইউক্রেনীয় কর্মকর্তাদের মতে, এসব দ্রুতগতির ড্রোন শনাক্ত ও প্রতিহত করা তুলনামূলক কঠিন। এর ফলে রাজধানীর ওপর দীর্ঘ সময় ধরে বিমান হামলার সতর্কতা জারি রাখতে হচ্ছে এবং শহরের স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হচ্ছে।
শীত মৌসুম সামনে রেখে ইউক্রেনের বিদ্যুৎ অবকাঠামো নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে। কিয়েভের গুরুত্বপূর্ণ সেতু, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থায় সাম্প্রতিক হামলাকে ইউক্রেন সম্ভাব্য বড় আকারের শীতকালীন বিমান অভিযানের অংশ হিসেবে দেখছে। রাশিয়া অবশ্য বলছে, তাদের লক্ষ্য সামরিক ও কৌশলগত স্থাপনা।
এদিকে যুদ্ধের পাশাপাশি রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত থামাতে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক তৎপরতাও অব্যাহত রয়েছে। রয়টার্স, নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বৈঠকে একটি বহু বিলিয়ন ডলারের সম্ভাব্য তেল চুক্তির বিষয়ও উঠে এসেছে। প্রস্তাবটির আওতায় রুশ জ্বালানি কোম্পানি লুকঅয়েলের তেলক্ষেত্র, শোধনাগার ও বিদেশি সম্পদ কেনার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক পুনর্গঠনের প্রতীক হিসেবেও এ ধরনের চুক্তি ব্যবহার করার চিন্তা রয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি এবং মার্কিন প্রশাসন, রুশ সরকার বা লুকঅয়েল আনুষ্ঠানিকভাবে প্রস্তাবটির বিষয়ে বিস্তারিত নিশ্চিত করেনি। ফলে এটি আপাতত আলোচনাধীন একটি সম্ভাব্য উদ্যোগ হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
অন্যদিকে, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি জানিয়েছেন, রাশিয়া হামলা বাড়ালে ইউক্রেনও রুশ তেল শোধনাগার ও জ্বালানি অবকাঠামোর বিরুদ্ধে পাল্টা হামলা জোরদার করবে। ফলে সামরিক সংঘাতের পাশাপাশি জ্বালানি অবকাঠামোকে ঘিরে রাশিয়া ও ইউক্রেনের পাল্টাপাল্টি আক্রমণও অব্যাহত রয়েছে।
কিয়েভের দুই গুরুত্বপূর্ণ সেতুতে ধারাবাহিক হামলায় রাজধানীর যোগাযোগব্যবস্থা যে চাপের মুখে পড়েছে, তাতে যুদ্ধের প্রভাব এখন আরও সরাসরি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে পড়ছে। একই সময়ে শীতকালীন হামলার আশঙ্কা এবং শান্তি আলোচনার অনিশ্চয়তা ইউক্রেনের পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।












